ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জিএম কাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির (জাপা) দুই শতাধিক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও এবিএম রহুল আমিন হাওলাদারের নেতৃত্বাধীন অংশটির কোনো প্রার্থীই বৈধতা পায়নি।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে- জাতীয় পার্টি একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল এবং লাঙ্গল প্রতীকের এই দলটির চেয়ারম্যান হিসেবে ইসির নথিতে এখনও জিএম কাদেরের নামই রয়েছে। ফলে চেয়ারম্যান ও মহাসচিবের স্বাক্ষরসহ অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সঠিক থাকায় জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির প্রার্থীদের বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। বিপরীতে, জাতীয় পার্টির পরিচয়ে মনোনয়নপত্র দাখিল করলেও চেয়ারম্যান ও মহাসচিবের স্বাক্ষর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী না থাকায় আনিসুল-হাওলাদার পক্ষের প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল করা হয়।
এমন প্রেক্ষাপটে আজ মঙ্গলবার লাঙ্গল প্রতীক কার কাছে থাকবে- সে বিষয়ে আদালতের রায় হওয়ার কথা রয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আদালতের রায় আনিসুল-হাওলাদারদের পক্ষে গেলেও নির্বাচনী তফসিলের কারণে এই সময়ে আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ তাদের নাও থাকতে পারে।
এ বিষয়ে ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, ‘যদি লাঙ্গল প্রতীক বরাদ্দ না পাই, তাহলে নির্বাচন থেকে সরে যাব। তবে আইনি লড়াই চলবে। আমরা দলের গঠনতন্ত্র মেনে কাউন্সিল করেছি। কাউন্সিলের মাধ্যমেই নেতাকর্মীরা আমাদের বৈধতা দিয়েছেন। আমরাই মূল জাতীয় পার্টি।’
অন্যদিকে জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী আমাদের সময়কে বলেন, ‘জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচন কমিশনে এখনও জিএম কাদেরের নাম রয়েছে। এই পরিচয়ে আমাদের দলের দুই শতাধিক প্রার্থী বৈধ হয়েছে।’
লাঙ্গল প্রতীকের মালিকানা নিয়ে আদালতে একটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে, যার রায় আজ মঙ্গলবার হওয়ার কথা। এ প্রসঙ্গে শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, ‘রায় আমাদের বিপক্ষে গেলে আমরা আপিল করব। তবে তফসিল যেহেতু হয়ে গেছে, এখন ঘড়ির কাঁটা উল্টো দিকে ঘোরার কথা নয়।’
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রার্থীদের দল পরিবর্তনের সুযোগ ছিল গত ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত। আগামী ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রার্থী বৈধতার কাজ চলবে এবং ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে। ফলে এই স্বল্প সময়ে আইনি লড়াইয়ে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৯ ডিসেম্বর জাতীয় পার্টির একাংশ ও জাতীয় পার্টির (জেপি) নেতৃত্বে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (এনডিএফ) জোট গঠিত হয়। আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন অংশসহ মোট ১৮টি দল রয়েছে এই জোটে। গত ২৩ ডিসেম্বর এনডিএফ জোট ১১৯টি আসনে ১৩১ জন প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দেয়। তবে মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষর-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে তাদের সব প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়।
এর আগেই জোটে থাকা জাতীয় পার্টি (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, জোটের মুখপাত্র ও মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, জাপার এই অংশের নেতা কাজী ফিরোজ রশীদ ও রত্ন হাওলাদার নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। তারা গণমাধ্যমে শারীরিক অসুস্থতার কথা জানালেও রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এর আগে গত ২৭ সেপ্টেম্বর প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন বলেছিলেন, ‘জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকের দাবিদার একাধিক। মালিক কে, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন।’ বর্তমানে জাতীয় পার্টি নামে ছয়টি দল সক্রিয় রয়েছে, যার মধ্যে তিনটি দল লাঙ্গল প্রতীক দাবি করছে।
লাঙ্গলের মালিকানা নিয়ে লড়াই পুরনো
দলটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জীবিত থাকা অবস্থাতেই প্রায় প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনের আগে জাতীয় পার্টিতে সংকট ও বিভাজন দেখা দিয়েছে। ১৯৯৯ সালে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সরকারে থাকা না থাকার প্রশ্নে দল ভেঙে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি (জেপি) গঠিত হয়। ওই সময় লাঙ্গল প্রতীক দাবি করলেও আদালতের রায়ে প্রতীকটি এরশাদের হাতেই থাকে।
২০১৯ সালে এরশাদের মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টিতে নেতৃত্ব ও প্রতীক নিয়ে টানাপড়েন আরও প্রকট হয়। ২০২৩ সালের উপনির্বাচনে রওশন এরশাদ নিজ মনোনীত প্রার্থীকে লাঙ্গল প্রতীক দিতে ইসিতে চিঠি দিলেও গঠনতন্ত্র অনুযায়ী না হওয়ায় তা বাতিল হয়। ফলে লাঙ্গলের নিয়ন্ত্রণ থাকে জিএম কাদেরের হাতেই।
দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে ভরাডুবির পর রওশনপন্থিরা জিএম কাদের ও মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুকে অব্যাহতি দিয়ে ইসিতে চিঠি দিলেও নির্বাচন কমিশন তা নামঞ্জুর করে। পরে তারা সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কমিটি ঘোষণা করে লাঙ্গল প্রতীকের দাবি তোলেন।
আনিসুল-হাওলাদারদের দাবি
গত ৯ আগস্ট আনিসুলপন্থিরা গুলশানে জাতীয় পার্টির দশম কাউন্সিল আয়োজন করে আনিসুল ইসলাম মাহমুদকে চেয়ারম্যান ও এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারকে মহাসচিব নির্বাচিত করেন। এর আগে জিএম কাদের তাদের বহিষ্কার করেছিলেন। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় তারা আদালতে মামলা করেন, যা পরে প্রত্যাহার করা হয়।
আজ মঙ্গলবার লাঙ্গল প্রতীকের দাবিতে আবারও আদালতের রায় হওয়ার কথা রয়েছে। এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার জানান, রায় ঘোষণার পর এ বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দেওয়া হবে।
