আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের নির্বাচনি ব্যয়ের উৎস ও পরিমাণে স্পষ্ট ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শীর্ষ নেতাদের হলফনামা বিশ্লেষণে উঠে এসেছে—কেউ নিজস্ব অর্থে, কেউ দলীয় অনুদানে, আবার কেউ ক্রাউড ফান্ডিংয়ের ওপর নির্ভর করে নির্বাচনি ব্যয় মেটানোর পরিকল্পনা করেছেন।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে জানা যায়, নিয়ম অনুযায়ী প্রার্থীদের হলফনামাসহ সম্ভাব্য নির্বাচনি ব্যয়ের বিবরণী জমা দিতে হয়, যা ইসির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে টিবিএস অন্তত ৩০টি আসনের ৭০ জন প্রার্থীর ব্যয়ের চিত্র পর্যালোচনা করেছে।
বিএনপি প্রার্থীদের ব্যয়: নিজস্ব তহবিলনির্ভর
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বগুড়া-৬ ও ঢাকা-১৭—দুটি আসন থেকেই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তিনি প্রতিটি আসনে নিজস্ব কৃষি খাত ও ব্যাংক আমানত থেকে ৩০ লাখ টাকা করে ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছেন। হলফনামা অনুযায়ী, তার মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১.৯৭ কোটি টাকা।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাকুরগাঁও-১ আসনে ৫.১৬ লাখ টাকা সম্ভাব্য ব্যয় দেখিয়েছেন। অন্যদিকে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ কক্সবাজার-১ আসনে নিজস্ব ফান্ড থেকে ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ের ঘোষণা দিয়েছেন।
তবে ঢাকা-২ আসনের প্রার্থী আমানউল্লাহ আমানের ব্যয়ের হিসাব ব্যতিক্রমী। তিনি সম্ভাব্য নির্বাচনি ব্যয় দেখিয়েছেন ২৫.১৭ কোটি টাকা, যা নির্ধারিত সীমার বহু গুণ বেশি।
জামায়াত প্রার্থীদের ব্যয়: দলীয় অনুদানের ভূমিকা
জামায়াতে ইসলামীর আমির মো. শফিকুর রহমান ঢাকা-১৫ আসনে নিজস্ব তহবিল থেকে ১০ লাখ টাকা এবং দলীয় ফান্ড থেকে ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছেন, যা নির্ধারিত সীমার মধ্যেই রয়েছে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার খুলনা-৫ আসনে নিজ তহবিল, আত্মীয়স্বজন ও দলীয় অনুদান মিলিয়ে মোট ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ের কথা উল্লেখ করেছেন। এছাড়া নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের কুমিল্লা-১১ আসনে ২৪ লাখ টাকা সম্ভাব্য ব্যয় দেখিয়েছেন।
এনসিপি প্রার্থীরা ক্রাউড ফান্ডিংয়ে নির্ভরশীল
জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ঢাকা-১১ আসনে নিজস্ব তহবিল থেকে ১ লাখ টাকা এবং ক্রাউড ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছেন। একইভাবে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন রংপুর-৪ আসনে ৫০ লাখ টাকার মধ্যে ৪৯ লাখ টাকা ক্রাউড ফান্ডিং থেকে সংগ্রহের কথা জানিয়েছেন।
এনসিপির আরেক নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ কুমিল্লা-৪ আসনে নিজস্ব তহবিল ও ক্রাউড ফান্ডিং মিলিয়ে মোট ৪০ লাখ টাকার বেশি ব্যয়ের হিসাব দিয়েছেন।
ব্যয়সীমা ও টিআইবির পর্যবেক্ষণ
নির্বাচনি বিধিমালা অনুযায়ী, একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা ব্যয় করতে পারবেন। তবে ভোটার সংখ্যা আড়াই লাখের বেশি হলে জনপ্রতি ১০ টাকা হারে অতিরিক্ত ব্যয়ের সুযোগ রয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জানিয়েছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীরা গড়ে ব্যয়সীমার ছয় গুণের বেশি খরচ করেছিলেন। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজনীতিতে অর্থের প্রয়োজন থাকলেও এর উৎস ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অর্থ, পেশিশক্তি বা অন্য প্রভাব যেন জনস্বার্থের ঊর্ধ্বে না যায়—সে বিষয়ে কঠোর নজরদারির আহ্বান জানান তিনি।
