হঠাৎ করেই মিরপুরের আকাশ অন্ধকার হয়ে এলো! গ্যালারিতে তখন হাজারো কণ্ঠের গর্জন, কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে ইতিহাসকে বন্দি করার অপেক্ষায়। স্কোরবোর্ডে অস্ট্রেলিয়ার ভাঙা প্রতিরোধ, মাঠজুড়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের উচ্ছ্বাস, আর ড্রেসিংরুমের বারান্দায় নিঃশ্বাস আটকে থাকা চোখগুলো-সব মিলিয়ে যেন নাটকীয় শেষ দৃশ্য। ঠিক সেই মুহূর্তে বৃষ্টি নামল। কিন্তু তার আগেই ঝড়ে উড়ে গেছে অস্ট্রেলিয়া। আজকের আগে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশ সর্বশেষ ওয়ানডে জিতেছিল ২০০৫ সালে।
২১ বছরের অপেক্ষা, অসংখ্য ব্যর্থতা, বারবার হাতছাড়া হয়ে যাওয়া সুযোগ-সব কিছুর হিসাব এক রাতেই চুকিয়ে দিল বাংলাদেশ। কার্ডিফের স্মৃতি পেরিয়ে এবার মিরপুরে লেখা হলো নতুন মহাকাব্য। আর সেই গল্পের নায়ক এমন একজন, যাকে হয়তো অনেকে ভুলতেই বসেছিল। প্রায় চার বছর পর জাতীয় দলে ফিরে মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত যেন নিজের ব্যাট দিয়েই লিখলেন প্রত্যাবর্তনের সবচেয়ে সুন্দর সংজ্ঞা।
আজ সিরিজের প্রথম ওয়ানডে ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতে বৃষ্টি আইনে ৮৬ রানে জিতল বাংলাদেশ। এই জয়ে ২১ বছর পর প্রথমবার ওয়ানডেতে অস্ট্রেলিয়াকে হারালো বাংলাদেশ। মিরপুরে পরাশক্তি অজিদের বিপক্ষে দিনটা ছিল বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের। প্রায় ৪ বছর পর ওয়ানডে দলে ফিরে ৮৬ রানের ইনিংস দিয়ে প্রত্যাবর্তন রাঙিয়েছেন মোসাদ্দেক হোসেন। এরপর ইনিংসের প্রথম বলেই উইকেট নিয়ে তিন দশক আগের স্মৃতি ফিরিয়েছেন পেসার তাসকিন আহমেদ।
ঘরের মাঠে ২৮৪ রান ডিফেন্ড করতে নেমে প্রথম বলেই ম্যাথু শর্টের উইকেট নেন তাসকিন। বাংলাদেশের হয়ে ১৯৯৫ সালে প্রথমবার এমন কীর্তি গড়েছিলেন সাইফুল ইসলাম। পরবর্তীতে ২০০৬ সালে একই রেকর্ডে নাম তুলেন সৈয়দ রাসেল।
মিরপুরের ব্যাটিং সহায়ক উইকেটে সুবিধা করতে পারেনি অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটাররা। রান তাড়া করতে নেমে ২ রানেই ২ উইকেট হারিয়ে ম্যাচ থেকে রীতিমতো ছিটকে পড়ে সফরকারীরা। ওপেনার কুপার কনোলি ও অধিনায়ক জশ ইংলিস চাপ সামলানোর চেষ্টা করলেও সফল হয়নি। দলীয় ৫১ রানে নাহিদ রানার বলে ইংলিস সাজঘরে ফেরেন ব্যক্তিগত ১৯ রানে। নাহিদ রানার বল সামলাতে না পারার পাশাপাশি কথার লড়াইয়ে মেজাজ হারিয়েছেন অজি অধিনায়ক।
পাওয়ার প্লে শেষ হওয়ার পরেই বলে তৃতীয় উইকেট হারায় অস্ট্রেলিয়া। এরপর দলকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন কলোনি ও অভিজ্ঞ অ্যালেক্স ক্যারি। এই জুটিকে অবশ্য বড় হতে দেননি মোসাদ্দেক। ৫০ বলে ৩৫ রানে থাকা কলোনিকে স্পিন ফাঁদে ফেলে আউট করেন তিনি।
স্কোরবোর্ডে ১০০ রানের আগেই ৪ উইকেট হারানো অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের জয় তখন সময়ের ব্যাপার। যদিও এক প্রান্ত আগলে রেখে অস্ট্রেলিয়াকে আশা দেখাচ্ছিলেন ক্যারি। শেষ পর্যন্ত অবশ্য নাহিদ রানার গতির কাছে হার মানতে হয় তাকে। দলীয় ১২৮ রানে ব্যক্তিগত ৪৭ রানে আউট হয়ে ফেরেন এই উইকেট রক্ষক ব্যাটার।
ক্যারির আউটের পর ম্যাচ তখন পুরোপুরি বাংলাদেশের দখলে। ১২৮ রানে ৫ উইকেট হারানো অস্ট্রেলিয়া পরের ১২ রান তুলতে হারায় আরও তিন উইকেট। ম্যাচে একমাত্র অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটার হিসেবে হাফসেঞ্চুরি করেছেন ক্যামেরুন গ্রিন। যদিও তার ৫২ রানের ইনিংস শুধু হারের ব্যবধান কমিয়েছে। বৃষ্টিতে খেলা বন্ধ হওয়ার আগে ৯ উইকেটে ১৯১ রান তুলে অস্ট্রেলিয়া। শেষ পর্যন্ত বৃষ্টি বন্ধ না হলে বৃষ্টি আইনে বাংলাদেশকে জয়ী ঘোষণা করা হয়।
নিউজিল্যান্ড, পাকিস্তানের পর গতি দিয়ে অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটারদেরও বুকে ভয় ধরিয়ে দিয়েছেন নাহিদ রানা। ম্যাচে সর্বোচ্চ ৪ উইকেটও নিয়েছেন এই পেসার। ওয়ানডে ক্যারিয়ারে এখন পর্যন্ত ১২ ম্যাচেই তুলেছেন ২৬ উইকেট। নাহিদ ছাড়াও ম্যাচে মোসাদ্দেক এবং মুস্তাফিজুর দুটি ও তাসকিন নিয়েছেন ১টি উইকেট।
এর আগে টস হেরে ব্যাট করতে নেমে তিন হাফ-সেঞ্চুরিতে ২৮৪ রানের সংগ্রহ পায় বাংলাদেশ। শুরুতেই ওপেনার সাইফ হাসানের উইকেট যাওয়ার পরেও পাওয়ার-প্লের সুবিধা তুলে নেয় স্বাগতিক ব্যাটাররা। অস্ট্রেলিয়ান বোলারদের বিপক্ষে ব্যাট হাতে তামিম ৫৪, শান্ত ৬৭ ও মোসাদ্দেক করেন অপরাজিত ৮৬ রান।
মিরপুরের মাঠেই বৃহস্পতিবার সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়া।
সংক্ষিপ্ত স্কোর-
বাংলাদেশ: ৫০ ওভারে ২৮৪/৮ (সাইফ ৫, তানজিদ ৫৪, শান্ত ৬৭, লিটন ৭, হৃদয় ৩১, মোসাদ্দেক ৮৬*, মিরাজ ৩, তানভির ৫, তাসকিন ২০; এলিস ৩/৩৮, স্কট ২/৫৭, রেনশ ২/৩৫)
অস্ট্রেলিয়া: ৪২.২ ওভারে ১৯১/৯ (কনোলি ৩৫, ইংলিস ১৯, কেয়ারি ৪৭, গ্রিন ৫২*, জ্যাম্পা ৬*; তাসকিন ১/২৮, মুস্তাফিজ ২/২৪, নাহিদ ৪/৪১, মিরাজ ১/২৩, মোসাদ্দেক ২/৩৭)
ফল: বাংলাদেশ বৃষ্টি আইনে ৮৬ রানে জয়ী
ম্যাচসেরা: মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত
