টানা কয়েক দিনের রেকর্ডভাঙা ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলসহ পার্বত্য জেলাগুলোতে এক ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান ও রাঙামাটিতে পাহাড়ধস, দেয়াল ধসে এবং পানিতে ডুবে গত পাঁচ দিনে অন্তত ৩৩ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এর মধ্যে বৃহস্পতিবারই (৯ জুলাই) বান্দরবানের লামা এবং কক্সবাজারের চকরিয়ায় পাহাড়ধসে দুই পরিবারের শিশুসহ ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বৃহত্তর চট্টগ্রামের প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ এখন চরম পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ু ও লঘুচাপের প্রভাবে আগামী আরও দু-এক দিন সারা দেশে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে, যা পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ ও সীমান্তের ওপারে ভারি বৃষ্টির কারণে দেশের নদ-নদীর পানি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটেছে।
বৃহত্তর চট্টগ্রামে লাশের মিছিল, পানিবন্দি ৫ লাখ মানুষ
শেষ পাঁচ দিনে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে বৃহত্তর চট্টগ্রামে যে ৩৩ জন মারা গেছেন, তাদের মধ্যে ১৫ জনই রোহিঙ্গা নাগরিক। জেলাওয়ারী হিসাবে কক্সবাজারের ২২ জন, চট্টগ্রামের ৫ জন, বান্দরবানের ৫ জন এবং রাঙামাটির ১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া বোয়ালখালী ও সাতকানিয়ায় আরও দুজন নিখোঁজ রয়েছেন।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, চট্টগ্রামে গত পাঁচ দিনে মোট ১০২০.৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এই রেকর্ড বৃষ্টির কারণে সড়ক ও রেলপথ ডুবে গিয়ে চট্টগ্রামের সঙ্গে কক্সবাজার এবং দুই পার্বত্য জেলা রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। জানালিহাটে রেললাইন পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় তিন দিনে মোট ১৮টি আন্তনগর ট্রেনের যাত্রা বাতিল করেছে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে।
সাতকানিয়ার ৮০% এলাকা পানির নিচে
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকাই এখন বানের জলে ভাসছে। সেখানে সাড়ে তিন লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, থানা ও আদালত প্রাঙ্গণেও পানি ঢুকে পড়েছে। সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত থাকায় রামপুর এলাকায় বাঁধের প্রায় ২০০ ফুট ভেঙে গেছে। বন্যা দুর্গতদের উদ্ধারে জরুরি ভিত্তিতে ১০টি স্পিডবোট চাওয়া হয়েছে।
লামা ও চকরিয়ায় পাহাড়ধসে ৭ প্রাণহানী
বান্দরবানের লামা উপজেলার আজিজনগর মিশনপাড়ায় পাহাড় ধসে দুটি ঘরের ওপর পড়লে মাটিচাপায় দুই পরিবারের পাঁচজন নিহত হন। নিহতরা হলেন— মো. ইউনুছ (২৮), তাঁর স্ত্রী রানু আক্তার (২২), তাঁদের চার বছরের সন্তান মো. সোলেমান, এবং অপর পরিবারের জুয়েল (২৭) ও তাঁর স্ত্রী কুলসুমা আক্তার (২৩)।
একই দিন ভোরে কক্সবাজারের চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নে বসতবাড়ির ওপর পাহাড়ধসে মোহাম্মদ কাজলের মেয়ে রুমি আক্তার (১৫) ও আব্দুল মজিদের ছেলে মোহাম্মদ তৌসিফ (১০) নামের দুই চাচাতো ভাই-বোনের মৃত্যু হয়। এছাড়া চকরিয়ায় ঢলের পানিতে ডুবে আড়াই বছরের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
সেনা সহায়তায় সাজেক ছাড়লেন ১৫০ পর্যটক
টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার নিম্নাঞ্চল এবং খাগড়াছড়ি-সাজেক সড়কের বিভিন্ন অংশ তলিয়ে যাওয়ায় ৫৬১ জন পর্যটক সাজেকে আটকে পড়েন। গতকাল সেনাবাহিনীর বিশেষ সহায়তায় তাদের মধ্যে ১৫০ জনকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বাকিদেরও দ্রুত ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। খাগড়াছড়ির দীঘিনালা এলাকায় সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় লংগদু, বাঘাইছড়ি ও সাজেক সড়কের সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
সিলেট অঞ্চল: ভারতের মেঘালয়ে ভারি বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় সিলেটের সুরমা ও কুশিয়ারাসহ প্রধান নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। সীমান্তঘেঁষা নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি আকস্মিক বন্যার আশঙ্কায় প্রশাসন ৫৩৭টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে ধলাই নদীর বাঁধ ভেঙে ২০-৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
খুলনা মহানগরী: হঠাৎ ভারি বর্ষণে খুলনা নগরীর নতুন বাজার, নিরালা, টুটপাড়াসহ বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল ও আবাসিক এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। বহু ঘরবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিństহানে পানি ঢুকে পড়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরবাসী।
সরকারি তৎপরতা ও ছুটি বাতিল
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জেলা প্রশাসনের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাপ্তাহিক ও সাধারণ ছুটি বাতিল করেছেন। বন্যাকবলিতদের জন্য জেলার ৬২৯টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে, যেখানে ইতিমধ্যে ৮ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। দুর্যোগ মোকাবেলায় ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় থেকে ২০০ মেট্রিক টন চাল ও ১০ লাখ টাকা এবং প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে আরও ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
