প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বর্তমান সরকার দুর্নীতি, মানিলন্ডারিং এবং আর্থিক অপরাধ দমনে বৃহত্তর কৌশলের গুরত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিদেশে পাচারকৃত সম্পদ পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে অর্থ পাচারের গন্তব্য দেশসমূহের মধ্যে প্রাথমিক ভাবে ১০টি দেশ চিহ্নিত করে তাদের সাথে চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে বলেও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
বুধবার (২২ এপ্রিল) বিকেলে জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. কামরুজ্জামানের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এই তথ্য জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অর্থ প্রবাহের পরিমাণ আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বছরে গড়ে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ১.৮ লাখ কোটি টাকা)। পাচারকৃত এ অর্থ একাধিক দেশে স্থানান্তরিত হওয়ার অভিযোগ থাকায় তা উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময়, সম্পদ শনাক্তকরণ এবং পারস্পরিক আইনগত সহায়তা জোরদার করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, এ লক্ষ্যে ‘পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি’ [Mutual Legal Assistance Treaty (MLAT)] সম্পাদন এবং Mutual Legal Assistance Request (MLAR) বিনিময় প্রক্রিয়ার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করছে। অর্থ পাচারের গন্তব্য দেশসমূহের মধ্যে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত ১০টি দেশের (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং হংকং-চায়না) মধ্যে তিন দেশ (মালয়েশিয়া, হংকং ও সংযুক্ত আরব আমিরাত) চুক্তি স্বাক্ষরেরর বিষয়ে সম্মতি প্রদান করেছে। অপর ৭টি দেশের সাথে চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তার লিখিত বক্তব্যে বলেন, ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের সভাপতিত্বে একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠ করা হয়েছে। এই টাস্ক ফোর্স কর্তৃক চিহ্নিত অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কেইসসমূহের অনুসন্ধান ও তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের নেতৃত্বে এবং বাংলাদেশ পুলিশের সিআইডি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সমন্বয়ে ১১টি যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত দল গঠন করা হয়েছে। এই তদন্ত দল গঠনের পর অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলাগুলোর অগ্রগতিও সংসদে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
অগ্রগতিসমূহ হচ্ছে :
বিজ্ঞ আদালত কর্তৃক দেশে ২৫ মার্চ, ২০২৬ পর্যন্ত সময়ে মোট ৫৭ হাজার ১ শত ৬৮ কোটি ৯ লক্ষ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ (Freezing) করা হয়েছে।
অপর দিকে বিজ্ঞ আদালতের নির্দেশে বিদেশে মোট ১৩ হাজার ২ শত ৭৮ কোটি ১৩ লক্ষ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে।
গব মিলিয়ে দেশে-বিদেশে সর্বমোট প্রায় ৭০ হাজার ৪ শত ৪৬ কোটি ২২ লক্ষ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ বিজ্ঞ আদালত কর্তৃক ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে।
পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ১৪১টি মামলা রুজু করা হয়েছে। যার মধ্যে ১৫টি মামলার চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে এবং ৬টি মামলার রায় প্রদান করা হয়েছে।
সার্বিকভাবে, বর্তমান সরকার দুর্নীতি, মানিলন্ডারিং এবং আর্থিক অপরাধ দমনে বৃহত্তর কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিদেশে পাচারকৃত সম্পদ পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে।
বিদেশে পাচারকৃত সম্পদ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করার লক্ষ্যে ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বাংলাদেশ ফিনান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিটের অধীনে স্টলেন এ্যাসেট রিকভারি ডিভিশন (Stolen Asset Recovery Division) গঠন করা হয়েছে।
গত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী আমলে সংঘটিত অর্থপাচার ও দুর্নীতির অনুসন্ধান করে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং এতে চিহ্নিত দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বিকেল তিনটায় সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনের শুরুতে ছিলো প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোকাল।
