জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের হত্যাকারীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির আদালত। বুধবার (২১ জানুয়ারি) নারা শহরের একটি আদালতে বিচারক শিনিচি তানাকা তেতসুয়া ইয়ামাগামির (৪৫) বিরুদ্ধে এই সাজা ঘোষণা করেন। খবর বিবিসি ও আলজাজিরা।
এর আগে ২০২২ সালে নারা শহরে একটি সমাবেশে শিনজো আবেকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই সময় ঘটনাটি পুরো বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে। ঘটনার তিন বছর পর তেতসুয়া ইয়ামাগামিকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
প্রসিকিউটররা বলেছেন, ইয়ামাগামি তার “গুরুতর কাজের” জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের যোগ্য। আবের হত্যাকাণ্ড দেশটিকে হতবাক করেছে, যেখানে কার্যত কোনো এমন অপরাধ নেই।
এদিকে ইয়ামাগামির আইনজীবী দল বলেছে, ইয়ামাগামি “ধর্মীয় নির্যাতনের” শিকার।
গত বছর বিচারের শুরুতেই তেতসুয়া ইয়ামাগামি খুনের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন, কিন্তু তাকে কীভাবে শাস্তি দেওয়া উচিত তা নিয়ে জাপানে জনমত বিভক্ত হয়ে পড়ে। যদিও অনেকেই ৪৫ বছর বয়সী এই ব্যক্তিকে একজন নিষ্ঠুর খুনি হিসেবে দেখেন, কেউ কেউ তার কষ্টকর লালন-পালনের প্রতি সহানুভূতিশীল।

তেতসুয়া ইয়ামাগামি (মাঝে) আদালতে আবে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। ছবি: রয়টার্স
বুধবার আদালতের শুনানিতে বলা হয়েছে, ইউনিফিকেশন চার্চের প্রতি তার মায়ের ভক্তি পরিবারকে দেউলিয়া করে দিয়েছিল এবং বিতর্কিত গির্জার সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সম্পর্ক বুঝতে পেরে ইয়ামাগামি তার প্রতি ক্ষোভ পোষণ করেন।
বিচারক শিনিচি তানাকা এএফপি সংবাদ সংস্থাকে জানিয়েছেন, ইয়ামাগামি আবেকে পেছন থেকে গুলি করেছিলেন। এই ঘটনাটি দেখায় যে তার কর্মকাণ্ড কতটা ঘৃণ্য এবং অত্যন্ত বিদ্বেষপূর্ণ ছিল।
রায় ঘোষণার সময় ইয়ামাগামি হাত জোড় করে এবং চোখ অবনত করে চুপচাপ বসে ছিলেন। শুনানিতে উপস্থিত থাকার জন্য প্রায় ৭০০ জন আদালত কক্ষের বাইরে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
প্রকাশ্য দিবালোকে আবের মর্মান্তিক মৃত্যু ইউনিফিকেশন চার্চ এবং এর সন্দেহজনক অনুশীলনগুলির তদন্তের সূত্রপাত করে, যার মধ্যে এর অনুসারীদের কাছ থেকে আর্থিকভাবে ধ্বংসাত্মক অনুদান চাওয়াও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এই মামলাটি জাপানের ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির রাজনীতিবিদদের সাথে তার যোগসূত্রও প্রকাশ করে এবং এর ফলে মন্ত্রিসভার বেশ কয়েকজন মন্ত্রী পদত্যাগ করেন।
শিনজো আবেকে হত্যা করলেন ইয়ামাগামি?
ইয়ামাগামির বাবা আত্মহত্যার পর তার মা গভীর হতাশায় পড়েন। আরেক ছেলেও গুরুতর অসুস্থ হন। এ অবস্থায় পরিবারকে ‘রক্ষা’ করার আশায় নিজের সব সম্পদ চার্চে দান করেন ইয়ামাগামির মা। শেষ পর্যন্ত মোট অনুদানের পরিমাণ ছিল প্রায় ১০ কোটি ইয়েন (তৎকালীন হিসাবে প্রায় ১০ লাখ ডলার)। পরিবার দেউলিয়া হওয়ায় ইয়ামাগামিকে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন বাদ দিতে হয়। ২০০৫ সালে তিনি নিজে আত্মহত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। কিন্তু তার অসুস্থ ভাই আত্মহত্যা করেন। এর বেশ কয়েক বছর পর ২০২০ সালে ইয়ামাগামি অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। নিজেই একটি আগ্নেয়াস্ত্র বানাতে শুরু করেন। বানানো শেষ হলে প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় গিয়ে সেটির পরীক্ষা চালান।
২০২২ সালের ৮ জুলাই জানের পশ্চিমাঞ্চলের শহর নারা’তে নির্বাচনী প্রচারের জন্য যান শিনজো আবে। তিনি বক্তব্য দেওয়ার সময় হঠাৎ গুলিবিদ্ধ হন। সেদিনই ঘটনাস্থল থেকে আটক হন ইয়ামাগামি।
বুধবার বিচারক তানাকা বলেন, ‘আসামির বেড়ে ওঠার পরিবেশ তার ব্যক্তিত্ব ও মানসিকতা গঠনে প্রভাব ফেলেছে, এবং তার কর্মকাণ্ডে তা পরোক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছে; এটি অস্বীকার করা যায় না।’
