একসময় গ্রামের মানুষকে ব্যাংকিং সেবা পেতে ভোরে রওনা হতে হতো উপজেলা কিংবা জেলা সদরের উদ্দেশে। সেই চিত্র এখন অনেকটা বদলে গেছে। গ্রামের হাট-বাজার কিংবা মোড়ের ছোট দোকানেই মিলছে প্রায় সব ধরনের ব্যাংকিং সেবা। যে দোকানটি একসময় ছিল কেবল বেচাকেনার জায়গা, সেটিই এখন গ্রামের মানুষের কাছে ব্যাংক। কেউ জমা দিচ্ছেন সঞ্চয়ের টাকা, কেউ তুলছেন বিদেশ থেকে পাঠানো রেমিট্যান্স, কেউ আবার জীবনে প্রথমবারের মতো হিসাব খুলে যুক্ত হচ্ছেন আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায়। এই ছোট ছোট দৃশ্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের নীরব কিন্তু গভীর পরিবর্তনের গল্প।
যাত্রা শুরুর এক যুগ না পেরোতেই এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক সংখ্যা ছাড়িয়েছে আড়াই কোটি। সংখ্যাটি কাগজে যতটা বড়, বাস্তবে তার তাৎপর্য আরও বেশি। কারণ এই গ্রাহকদের প্রায় ৮৫ শতাংশই গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ- যারা আগে কখনও ব্যাংকের শাখায় যাননি বা যাওয়ার সুযোগ পাননি। ব্যাংক শাখার স্বল্পতা, দীর্ঘ দূরত্ব ও যাতায়াত ব্যয়ের বাস্তবতায় এজেন্ট ব্যাংকিং এখন গ্রামবাংলার মানুষের প্রধান ভরসা।
এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো নারী হিসাবের দ্রুত বৃদ্ধি। মোট আমানত হিসাবের প্রায় অর্ধেকই নারীদের, যার বড় অংশ গ্রামীণ ও অনুন্নত অঞ্চলের। অর্থাৎ পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও সমানতালে আর্থিক সেবার আওতায় আসছেন- যা আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি রেমিট্যান্স গ্রহণ ও ঋণ বিতরণেও এই চ্যানেলটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
এজেন্ট ব্যাংকিং হলো ব্যাংকের শাখা না খুলে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবা দেওয়ার একটি ব্যবস্থা। দেশে ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে এই সেবা চালু হয়। বেসরকারি ব্যাংক এশিয়া মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদীখান উপজেলায় এজেন্ট নিয়োগের মাধ্যমে ওই বছরের ১৭ জানুয়ারি পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম কার্যক্রম শুরু করে। এর আগে ২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর এজেন্ট ব্যাংকিং পরিচালনাসংক্রান্ত নীতিমালা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। শুরুতে শুধু পল্লী এলাকায় এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের অনুমতি থাকলেও পরের বছর নীতিমালা সংশোধন করে পৌর ও শহর এলাকাতেও এই সেবা চালুর সুযোগ দেওয়া হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক ৩১টি ব্যাংককে এজেন্ট ব্যাংকিং চালুর অনুমোদন দিয়েছে, যার মধ্যে ৩০টি ব্যাংক সক্রিয়ভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দেশজুড়ে ১৫ হাজার ৩২১ জন এজেন্টের তত্ত্বাবধানে ২০ হাজার ৪৮৮টি আউটলেটের মাধ্যমে এ সেবা দেওয়া হচ্ছে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে এজেন্ট ব্যাংকিং সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে- বিশেষ করে গ্রামীণ, দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে।
এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তৌহিদুল আলম খান আমাদের সময়কে বলেন, এজেন্ট ব্যাংকিং গ্রাহকদের জীবনমানে বড় পরিবর্তন এনেছে। আগে সামান্য লেনদেনের জন্যও গ্রাহকদের দূরের শাখায় যেতে হতো, এতে সময়, শ্রম ও অর্থের অপচয় হতো। এখন তারা নিজ এলাকাতেই হিসাব খোলা, নগদ জমা ও উত্তোলন, ব্যালেন্স অনুসন্ধান, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ ও রেমিট্যান্স গ্রহণসহ প্রয়োজনীয় সব সেবা পাচ্ছেন। বিশেষ করে কৃষক, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও প্রবাসী পরিবারের সদস্যদের জন্য এজেন্ট ব্যাংকিং আর্থিক লেনদেনকে সহজ ও নিয়মিত করেছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাসাবাড়ির নিচে কিংবা স্থানীয় হাট-বাজারের ছোট দোকানের এজেন্ট আউটলেট থেকে ব্যাংকের প্রায় সব ধরনের সেবা পাওয়া যাচ্ছে। হিসাব খোলা, টাকা জমা ও উত্তোলন, হিসাবান্তরে অর্থ স্থানান্তর, বিদেশ থেকে পাঠানো রেমিট্যান্স গ্রহণ, ইউটিলিটি বিল ও যানবাহনের লাইসেন্স ও ফিটনেস ফি পরিশোধ, ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণ ও আদায় এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতা বিতরণ- সবই হচ্ছে এই মাধ্যমে। পাশাপাশি ডেবিট কার্ড, চেকবই ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং সুবিধাও মিলছে। বাড়তি কোনো চার্জ ছাড়াই বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নিরাপদ লেনদেন করতে পারায় সেবাটির জনপ্রিয়তা ক্রমেই বাড়ছে।
এক সময় সারাদেশে এজেন্ট ব্যাংকিং বিস্তারের নেতৃত্ব দেন ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আরফান আলী। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে এজেন্ট ব্যাংকিং বড় ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে এই সেবায় আড়াই কোটির বেশি গ্রাহক এবং আমানত প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। এর চেয়েও বড় অর্জন হলো- যেসব গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকের কোনো উপস্থিতি ছিল না, সেখানে এই সেবা পৌঁছে গেছে। নারীদের অন্তর্ভুক্তিও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের বড় সাফল্য। ভবিষ্যতে ডিজিটাল অ্যাপ্রোচ বাড়ানো, এজেন্টদের প্রশিক্ষণ জোরদার করা এবং গ্রাহকদের আর্থিক শিক্ষায় সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
গ্রাহক ছাড়িয়েছে আড়াই কোটি
বাসার পাশেই সেবা পাওয়ায় এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। গত সেপ্টেম্বর শেষে মোট আমানত হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৫১ লাখ ৩৯ হাজার ২৯৩টি, যা এক বছর আগে ছিল ২ কোটি ৩৪ লাখ ৮৯ হাজার ১০৯টি। এক বছরে হিসাব বেড়েছে ১৬ লাখ ৫০ হাজারের বেশি। এর মধ্যে গ্রামীণ হিসাবই সংখ্যাগরিষ্ঠ। শহরে হিসাব যেখানে প্রায় ৩৭ লাখ, সেখানে গ্রামে তা ছাড়িয়েছে ২ কোটি ১৩ লাখ। নারী হিসাবের সংখ্যাও আশাব্যঞ্জক- মোট হিসাবের প্রায় অর্ধেকই নারীদের।
ব্যাংকভিত্তিক হিসাবের চিত্রেও বৈচিত্র্য স্পষ্ট। রাষ্ট্রায়ত্ত, বেসরকারি ও ইসলামী- সব ধরনের ব্যাংকই এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে যুক্ত থাকলেও কয়েকটি বড় ব্যাংকের দখলে রয়েছে হিসাবের বড় অংশ। এজেন্ট ব্যাংকিং সেবায় সবচেয়ে বেশি আমানত হিসাব রয়েছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটিতে মোট হিসাব সংখ্যা ৭৬ লাখ ১৩ হাজার ৬২১। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ব্যাংক এশিয়ার মোট হিসাব সংখ্যা ৭৪ লাখ ৩৫ হাজার ৭২৭টি। আর ৫৬ লাখ ১০ হাজার ১৪৫টি হিসাব সংখ্যা নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আরিফ হোসেন খান আমাদের সময়কে বলেন, এজেন্ট ব্যাংকিং দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে কার্যকর মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সব ক্ষেত্রেই এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, তবে এখনো হাওর ও চরাঞ্চলের মতো দুর্গম এলাকায় এই সেবা পুরোপুরি পৌঁছায়নি। এসব এলাকায় এজেন্ট ব্যাংকিং সম্প্রসারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান তিনি।
দ্রুত বাড়ছে আমানত
গত এক বছরে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সংগৃহীত আমানত বেড়েছে প্রায় ৮ হাজার ১৭১ কোটি টাকা। গত সেপ্টেম্বর শেষে মোট আমানত দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৭ হাজার ৭০০ কোটি টাকা, যার প্রায় ৮৩ শতাংশই এসেছে গ্রামাঞ্চল থেকে। সবচেয়ে বেশি ২১ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা আমানত পেয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা। আর ৬ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা আমানত সংগ্রহ করে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ব্যাংক এশিয়া।
গ্রামে রেমিট্যান্স প্রেরণে ভরসা
রেমিট্যান্স প্রেরণ ও বিতরণে এই চ্যানেলটি হয়ে উঠেছে ভরসার নতুন ঠিকানা। গত সেপ্টেম্বর শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আওতায় রেমিট্যান্সের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৮ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা। যা ২০২৪ সালের একই সময় পর্যন্ত ছিল ১ লাখ ৬৫ হাজার ৬৫৯ কোটি টাকা। ফলে এক বছরে রেমিট্যান্স বিতরণ বেড়েছে প্রায় ২৩ হাজার ১৯৬ কোটি টাকা বা ১৪ শতাংশ। এর মধ্যে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর এই তিন মাসেই রেমিট্যান্স বিতরণ বেড়েছে প্রায় ৪ হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা বা ২ দশমিক ৭০ শতাংশ। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ লাখ ২ হাজার ৯১৬ কোটি টাকার রেমিট্যান্স বিতরণ করে শীর্ষে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। আর দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ডাচ্-বাংলা ব্যাংবের রেমিট্যান্স বিতরণের স্থিতি ৫৩ হাজাজার ৩৭৭ কোটি টাকা।
ঋণ বিতরণেও বড় অগ্রগতি
এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ঋণ বিতরণেও বড় প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। গত এক বছরে এই খাতে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৫১ শতাংশের বেশি। গত সেপ্টেম্বর শেষে ঋণ বিতরণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৩১ হাজার ৯১০ কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছিল ২১ হাজার ৮৯ কোটি টাকা। ফলে গত এক বছরে এই সেবায় ঋণ বিতরণ বেড়েছে প্রায় ১০ হাজার ৮২০ কোটি টাকা বা ৫১ দশমিক ৩১ শতাংশ। এর মধ্যে শেষ তিন মাসে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ২ হাজার ৯০২ কোটি টাকা। মোট ঋণের মধ্যে গ্রামে বিতরণ হয়েছে ২০ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা। অন্যদিকে ঋণ পাওয়ায় এগিয়ে পুরুষ গ্রাহকরা। তাদের কাছে কেন্দ্রীভূত ২৬ হাজার ৭১২ কোটি টাকা।
ব্র্যাক ব্যাংকের অল্টারনেট ব্যাংকিং চ্যানেলস প্রধান এবং উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুর রহিম আমাদের সময়কে বলেন, অনেক সময় ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের বাইরে থাকা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অর্থায়নের আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ে। এজেন্ট ব্যাংকিং সেই ব্যবধান দূর করে সকল শ্রেণির মানুষের কাছে অর্থায়নের সুযোগ পৌঁছে দিয়েছে। এখন গ্রামের এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহায়তা নিয়ে সহজে ঋণ আবেদন করা যাচ্ছে।
