কণ্ঠশিল্পী আঁখি আলমগীরের আজ জন্মদিন। ১৯৯৭ সালে প্রকাশ হয় তার প্রথম একক অ্যালবাম ‘প্রথম কলি’। এরপর গানের ভুবনে অবিরাম পথা চলা। কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী রুনা লায়লার সুরে ‘গল্পকথার ওই কল্পলোকে’ গানটি গেয়ে পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। এছাড়াও ‘কি করে বলি তোমায়’, ‘তুমি আমার কত যে আপন’, ‘বোকামন’, ‘পৃথিবীর কাছ থেকে সূর্য বিদায় নিল’, ‘গান যদি জীবনের মতো হয়’, ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’, ‘পিরিতি বিষের কাঁটা’, ‘বাবুজি’ ও ‘ল্যায়লা’সহ উপহার দিয়েছেন আরও অসংখ্য জনপ্রিয় গান। বিশেষ এই দিনটি উপলক্ষে কথা হয় তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন-তারেক আনন্দ
আজ আপনার বিশেষ দিন, জন্মদিন। আজকের দিনটি কীভাবে কাটবে?
দেশের বাইরে এসেছি বিশেষ দিন কাটাতে, আমার দুই মেয়ের কাছে। বাচ্চাদের সঙ্গে জন্মদিন উদযাপন করব। এ কারণে এবারের জন্মদিন আরও বেশি বিশেষ।
নতুন বছর আসে, নতুন নতুন উপলব্ধি তৈরি হয়। এই বছরের জন্মদিনের উপলব্ধির কথা জানতে চাই…
নতুন বছর আর আমার জন্মদিন আসলে একদম কাছাকাছিভাবেই আসে। প্রতিবছরই ঠিক করি, নতুন কিছু শিখব। জন্মদিনটা সবার সঙ্গে আনন্দ নিয়ে উদযাপন করব; কিন্তু দেখা যায় প্রতিবছরই ব্যস্ততার কারণে তেমন কিছু করা হয় না। জন্মদিন বেশিরভাগ সময় ফ্রেন্ডস অ্যান্ড ফ্যামিলি মেম্বারদের নিয়ে হয়। কিন্তু আমার মাঝে মাঝে ইচ্ছা হয়, কলিগদের নিয়ে বা মিডিয়ার মানুষদের নিয়ে দিনটি উদযাপন করি। সেটি সময় ও ব্যস্ততার কারণে করা হয় না। মেয়েরা পড়াশোনার কারণে বাইরে আছে, একটু ফ্রি সময় ছিল তাই ওদের কাছে চলে এসেছি।
দীর্ঘ এই সংগীতজীবনে যদি বলা হয়, শিল্পী হিসেবে কোনো আফসোসের জায়গা আছে?
আফসোস শব্দটা আমার জীবনে নেই। মানুষের মাঝে হাসি, দুঃখ, কষ্ট, লোভ, হিংসা রাগ আরও অনেক কিছু থাকে। আফসোসও হয়তো তার মধ্যে একটা। আফসোস জিনিসটা আমার ভেতরে জন্মগতভাবেই নেই। হিংসা জিনিসটাকে সেলফ মেডিটেশনের মাধমে আমার ভেতর থেকে সরিয়ে ফেলছি। অনেক বড় ড্রিমও আমার ভেতরে নেই। শিল্পী হিসেবেও কোনো আফসোস নেই, মানুষ হিসেবেও তেমন কোনো আফসোস নেই। তবে অন্য মানুষের অপছন্দের কিছু দেখলে, তার জন্য আফসোস হয়, করুণা হয়। নিজেকে ভেতরে ভেতরে সাদামাটা করে ফেলেছি। মেন্টালি চমৎকারভাবে শান্তির একটা জায়গায় নিয়ে আসতে পেরেছি।
সংস্কৃতি, সংগীতের বর্তমান অস্থিরতাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
অস্থিরতা বলব না, অস্থিরতা প্রশ্নটা আমাকে অনেক আগেও করা হয়েছে। তার মানে আগেও হয়তো অস্থিরতা ছিল এবং কখনই এটাকে অস্থিরভাবে দেখি না। এটাকে ছোট পরিবর্তন এবং অনেক বড় পরিবর্তন এবং ভালোর জন্য পরিবর্তন বা খারাপের জন্য পরিবর্তন হিসেবে দেখি। আসলে আমাদের বর্তমান সংগীত জগত, মিডিয়া বা অন্য কোনো কিছু অস্থির হয়নি, আমরা অস্থির হয়ে গেছি। মানুষ অস্থির হয়ে গেছে। মানুষ যেভাবে চলবে, সবকিছুই সেভাবে চালাতে চায়Ñ এটাই হয়েছে সমস্যা। মানুষের অস্থিরতা আমাদের কর্মক্ষেত্রকে অস্থির করে তুলেছে। আমি সবকিছুর সঙ্গে নিজেকে একটু মানিয়ে চলার মতো মানুষ। সেটা আমার ক্যারিয়ার হোক, আর পার্সোনাল লাইফই হোক, মোটামুটি মানিয়ে চলতে পারি। আমার কাছে মনে হয়, যে যেভাবে কাজ করছে, যেভাবে কাজ করতে চায়, চলতে চায়, গাইতে চায়, নাচতে চায়, অভিনয় করতে চায়; তাকে সেটা করতে দেওয়া উচিত। এখানে জাজমেন্টের কিছু নেই।
আঁখি আলমগীর। স্টেজের রানী। স্টেজে ওঠা মানেই দর্শকের উন্মাদনা। কয়েক দশক ধরে সমানতালে স্টেজ মাতিয়ে যাচ্ছেন। এই সমান জনপ্রিয়তা ধরে রাখার রহস্য কী?
৩০ দিনে ৩৫টি শো করেছিÑ এরকম একটা রেকর্ড আছে। এগুলো তখন মনে হয়েছিল বিরাট কিছু। এখন মনে হচ্ছে, নিজের প্রতি, কণ্ঠের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে। খুব সহজ ছিল না। আমি অনেক হিউমান বিং আর্টিস্ট। এখন শুধু ভালো কাজ করব, ভালো জায়গায় যাব, ভালো গান করব, আনন্দে বাঁচব। স্টেজের রানী না, আমি আসলে খুব লাকি একজন আর্টিস্ট। দর্শক ভালোবাসেÑ এটা আল্লাহর রহমত। পেছনে ফিরে তাকালে দেখি লং জার্নি, বিউটিফুল জার্নি। জনপ্রিয়তা ধরে রাখার কোনো রহস্য নেই। আমার মতো চলেছি, আমার যখন থামার, থেমেছি। যখন ছুটি নেওয়ার, ছুটি নিয়েছি। বাচ্চাদের নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছে, দুই মাসের জন্য ঘুরতে চলে গিয়েছি। কোনো দিকে তাকাইনি। আমার মতো চলেছি, কাউকে ঠকাইনি, কাউকে ভাসাইনি। কাজের ক্ষেত্রে কাউকে মিথ্যা বলে কাজ ছাড়িনি, কাউকে ছোট করিনি। কাউকে অপমান করিনি, কখনও কেউ বলতে পারবে না। এমন না যে, সবার সবকিছু ভালো লেগেছে, কিছু অপছন্দ হয়েছে, আমি বুঝতে দিইনি। সবাইকে নিয়ে সমানভাবে চলেছি। এটা হয়তো আমার সিক্রেট হতে পারে। মানুষের সঙ্গে যে গুড বিহেভটা করিÑ এটা কামস ফ্রম মাই হার্ট। অভিনয় না, আমি যাকে পছন্দ করি না, তাকে অপমানও করি না; শুধু এড়িয়ে চলি। চেষ্টা করি তাকে একটু বোঝানোর, বা তার ভুল ধরিয়ে দেওয়ার। এগুলো আমি সবসময় মেনটেন করেছি।
তারকা অতিথিদের নিয়ে উপস্থাপনা করছেন। উপস্থাপনার অভিজ্ঞতা কেমন হচ্ছে। সামনে আর কোনো পরিকল্পনা?
উপস্থাপনা বলেন বা মডেলিং বলেনÑ এটা আমার জাস্ট শখের জায়গা। আমি গল্প করতে পছন্দ করি। উপস্থাপক হিসেবে তারকাদের সঙ্গে বসি না। গল্প করতে বসি। ভাইরাল হওয়ার কোনো টপিকে কথা বলতে চাই না। সেই শিল্পীর কিছু কাজ এবং শিল্পীর ব্যক্তিত্বটাকে ফুটিয়ে তুলতে চাই। একজন শিল্পী অনেক বড় হয়, তার চেয়েও বড় কিন্তু ব্যক্তি-মানুষটা। ব্যক্তি বড় না হলে শিল্পী সেখানে যেতে পারে না। ব্যক্তিত্বটাকে সামনে আনার চেষ্টা করি। গল্প বলেন, উপস্থাপনা বলেন, আমার খুব ভালো লাগে। এটা মাঝে মাঝেই করব।
নতুন বছরে শ্রোতাদের কবে নাগাদ গান উপহার দিচ্ছেন, কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা?
অনেকগুলো গানই রেডি। আমার কাজ গেয়ে চলে আসা বা শুটিং করে চলে আসা। বাকি সবকিছু নির্ভর করে প্রোডাকশন হাউসের ওপর, সম্পূর্ণ তাদের ইচ্ছা। তবে আমি দুই-চারটা গান প্রকাশ করব নিজের চ্যানেলের জন্য। সারাজীবন গান গেয়েছি, এখন অল্প গান করব। স্টেজ শো করব। কেউ ডাকলে যেটা ভালো লাগবে, সেই গানটা গাইব। আমাকে আর প্রমাণ করার কিছু নেই, কাউকে দেখানোরও কিছু নেই। যারা নতুন, তাদের ভেতরে একটা প্রতিযোগিতা হতে পারে। নতুনদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বিশ্বাসী না। নতুনদের সঙ্গে নিয়ে চলায় বিশ্বাসী।
