বাণিজ্যিক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করতে অবশেষে দেশে বহুল আকাক্সিক্ষত বিশেষায়িত বাণিজ্যিক আদালত চালু হতে যাচ্ছে। এ জন্য সরকার গত বৃহস্পতিবার বাণিজ্যিক আদালত অধ্যাদেশ, ২০২৬ নামে একটি অধ্যাদেশ জারি করেছে। অধ্যাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্যসংক্রান্ত যে কোনো মামলা বাণিজ্যিক আদালতে দায়েরের ৯০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির বিধান রাখা হয়েছে। এ ছাড়া বাণিজ্যসংক্রান্ত যে কোনো বিরোধ নিষ্পত্তি করতে আদালতের বাইরে মধ্যস্থতার বিধানও যুক্ত হয়েছে। বাণিজ্যিক আদালতে চলমান মামলার চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট আদালতের কোনো আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করা যাবে না। তবে দেওয়ানি কার্যবিধির নীতি ও বিধান অনুসরণ করে রিভিশন ও রিভিউ দায়ের করা যাবে।
বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে গতিশীল করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে অধ্যাদেশে উল্লেখ করা হয়েছে। জেলা পর্যায় হতে শুরু করে উচ্চ আদালত পর্যন্ত দ্রুততর সময়ে বাণিজ্য বিরোধের মামলাগুলো নিষ্পত্তি হলে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধিসহ অর্থনীতিতে গতিশীলতা আসবে। এ ছাড়া সরকারের এই উদ্যোগ ব্যবসা-বাণিজ্যে আস্থা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ ও রপ্তানিকারক শিল্প মালিকদের সংগঠন ইএবির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম গতকাল শুক্রবার আমাদের সময়কে বলেন, সরকারের এমন সিদ্ধান্তকে ব্যবসায়ী সমাজের পক্ষ থেকে স্বাগত জানাই। সরকার ভালো উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা লেনদেনের ক্ষেত্রে অনেক সময় নিরাপত্তাহীনতায় থাকেন। যে কোনো বিরোধ নিষ্পত্তি করতে মামলা করলে বছরের পর বছর ঘুরতে হয়, কিন্তু নিষ্পত্তি হয় না। পাওনা অর্থও ফেরত পাওয়া যায় না। আশা করা যায় এই বিড়ম্বনা থেকে ব্যবসায়ীরা মুক্তি পাবেন।
ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের জেলা পর্যায় থেকে শুরু করে হাইকোর্ট পর্যন্ত বিশেষায়িত বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। শ্রীলংকায় বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য হাইকোর্ট পর্যায়ে বিশেষ আদালত রয়েছে।
গত জুন মাস পর্যন্ত সারা দেশের আদালতগুলোতে মোট ৪৬ লাখ ৫০ হাজার মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে সুপ্রিমকোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগ এবং সারা দেশের অধস্তন আদালতগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক করপোরেট বিরোধ ঝুলে আছে।
গত বছরের নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে নিবন্ধিত কোম্পানির সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৮ হাজার ৮৬৯টি। অথচ হাইকোর্ট বিভাগের মাত্র দুটি বেঞ্চ অন্যান্য মামলার পাশাপাশি করপোরেট বিরোধগুলো পরিচালনা করে, যা নিষ্পত্তি করতে দীর্ঘ সময় লাগছে।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী বাণিজ্যিক আদালতগুলো ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বণিকদের সাধারণ লেনদেন, বীমাসংক্রান্ত বিষয় যার মধ্যে বাণিজ্যিক দলিলসমূহের প্রয়োগ ও ব্যাখ্যা অন্তর্ভুক্তÑ এমন ২৩ ধরনের বাণিজ্যিক বিরোধের বিচার করতে পারবে। এ ছাড়া সুপ্রিমকোর্ট সচিবালয় বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সময় সময় অন্য যে কোনো বাণিজ্যিক বিরোধকে বাণিজ্যিক আদালতের এখতিয়ারভুক্ত করতে পারবে বলে অধ্যাদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই অধ্যাদেশ কার্যকর হওয়ার পর কোনো দেওয়ানী আদালতে কোনো বাণিজ্যিক বিরোধ বা তদসংক্রান্ত কোনো কার্যধারা বিচারাধীন থাকলে উক্ত কার্যধারা, সংশ্লিষ্ট এখতিয়ারসম্পন্ন বাণিজ্যিক আদালতে স্থানান্তর হবে। তবে কোনো কার্যধারার কোনো অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চতর কোনো আদালতে কোনো আপিল বা রিভিশন চলমান থাকলে, উক্ত আপিল বা রিভিশন নিষ্পত্তি হওয়ার পর মূল কার্যধারাটি বাণিজ্যিক আদালতে স্থানান্তরিত হবে।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, বাণিজ্যিক আদালতে দায়ের করা যে কোনো মামলা চূড়ান্ত শুনানির জন্য নির্ধারণ করার তারিখ হতে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে কোনো প্রকার ব্যতিক্রম ব্যতিরেকে চূড়ান্ত শুনানি সম্পন্ন করতে হবে। চূড়ান্ত শুনানির পূর্বে যে কোনো পক্ষ উপযুক্ত কারণ প্রদর্শনপূর্বক সর্বোচ্চ তিনবার সময় প্রার্থনা করতে পারবে। বাণিজ্যিক আদালত সন্তুষ্ট হলে যুক্তিসঙ্গত খরচ নির্ধারণ করে উক্ত আবেদন মঞ্জুর করতে পারবে। তবে শর্ত থাকে যে, কোনো পক্ষের ইচ্ছাকৃত কর্ম, কর্মবিরতি বা গাফিলতির কারণে এই নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কোনো মামলা নিষ্পত্তি করা সম্ভব না হলে বাণিজ্যিক আদালত তার বিবেচনায় উক্ত পক্ষের ওপর উপযুক্ত পরিমাণ খরচ আরোপ করতে পারবে। উক্ত খরচ পরিশোধ না করা পর্যন্ত সেই পক্ষ মামলার কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবে না।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, মামলা দায়েরের পর রায়ের পূর্বে যে-কোনো পর্যায়ে, উভয়পক্ষ সম্মত হলে বাণিজ্যিক আদালত মধ্যস্থতার মাধ্যমে মামলাটি নিষ্পত্তির অনুমতি প্রদান করতে পারবে। এ ছাড়া প্যানেল মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে কিংবা পক্ষগণের সম্মতি ও আদালতের অনুমতিক্রমে অন্য যে-কোনো উপযুক্ত মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ করে বিরোধ নিষ্পত্তি করা যাবে। তবে মধ্যস্থতা কার্যক্রম ৩০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মধ্যস্থতা কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব না হলে বিষয়টি আদালতে জানাতে হবে। বাণিজ্যিক আদালত উপযুক্ত মনে করলে মধ্যস্থতার জন্য অতিরিক্ত ৩০ দিন সময় বর্ধিত করতে পারবে।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের জেলা জজ বা অতিরিক্ত জেলা জজগণের মধ্য হতে বাণিজ্যিক আদালতের বিচারক নিযুক্ত হবেন। নিয়োগের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক আইনের ওপর উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী বা বাণিজ্যিক বিরোধের ওপর অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণসম্পন্ন বিচারকগণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি বাণিজ্যিক আদালতের রায় বা আদেশসমূহের বিরুদে আপিল ও রিভিশন শুনানির নিমিত্ত প্রয়োজনীয় আদেশ দ্বারা বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের হাই বিভাগে এক বা একাধিক বাণিজ্যিক আপিল বেঞ্চ গঠন করবেন।
বাণিজ্যিক বিরোধের যে কোনো পক্ষ বাণিজ্যিক আদালতের রায় বা আদেশ দ্বারা সংক্ষুব্ধ হলে, তিনি উক্ত রায় বা আদেশ প্রদানের তারিখ হতে ৬০ দিনের মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগে আপিল বা ক্ষেত্রমত রিভিশন দাখিল করতে পারবেন।
সম্প্রতি এক সেমিনারে সদ্য বিদায়ী প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেন, দ্রুত, দক্ষ এবং স্বচ্ছ বিচার প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দিয়ে আমরা বাণিজ্যিক ন্যায়বিচারের একটি শক্তিশালী কাঠামো তৈরি করছি। দেশি হোক বা বিদেশি বিনিয়োগকারীরা একটি দেশকে শুধু কর প্রণোদনা বা অবকাঠামো দিয়ে বিচার করেন না। তারা নিশ্চয়তা চান। তারা আশ্বাস চান যে চুক্তির সম্মান করা হবে, অধিকার সুরক্ষিত থাকবে এবং বিরোধগুলো দশকের পর দশক ধরে নয়, বরং কয়েক মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি হবে।
