Home খেলামহাকাব্যিক জয় বাংলাদেশের

মহাকাব্যিক জয় বাংলাদেশের

by thedeshbangla
0 comments

জয়ের মঞ্চটা যেন তৈরি ছিল আগের দিনই। আজ শুধু সেই মঞ্চে উঠে স্বপ্নের মত এক ইতিহাস লিখে দিল বাংলাদেশ!

রোমাঞ্চ, বিস্ময় আর স্বপ্নপূরণের এক অবিশ্বাস্য গল্পের জন্ম হলো অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা ছুঁয়ে ফেলল সেই অধরা স্বপ্ন-অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়!

ডারউইনের আকাশে আজ তাই শুধু বিজয়ের রং নয়, উড়ছে বাংলাদেশের ক্রিকেটের নতুন স্বপ্নও! স্বাগতিকদের রীতিমতো চমকে দিয়ে ৯ উইকেটের দুর্দান্ত জয়ে বাংলাদেশ তুলে নিল এক ঐতিহাসিক টেস্ট জয়।

যে জয় শুধু একটি ম্যাচের জয় নয়-এ যেন আত্মবিশ্বাসের নতুন সূর্যোদয়, ইতিহাসের পাতায় লাল-সবুজের অমর এক স্বাক্ষর!

২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পা রাখার আগেই বাংলাদেশের সামনে প্রশ্ন ছিল-টেস্টটা আদৌ তৃতীয় দিন পর্যন্ত নেওয়া যাবে তো? র‌্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর দলের বিপক্ষে নবম স্থানে থাকা বাংলাদেশের জন্য লড়াই করাটাই যেখানে বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে চার দিন পর গল্পটা দাঁড়াল সম্পূর্ণ উল্টো। অস্ট্রেলিয়াকে তাদের নিজেদের মাটিতে ৯ উইকেটে হারিয়ে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখল বাংলাদেশ। হিসাব উল্টে দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথমবারের মতো টেস্ট জিতল টাইগাররা!

ডারউইনে নাজমুল হোসেন শান্তর দল যে জয় তুলে নিয়েছে, তার মাহাত্ম্য শুধু স্কোরবোর্ডের ৯ উইকেটে জয়েই সীমাবদ্ধ নয়। টানা ১১টি সেশন অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ন্ত্রণে রেখে বাংলাদেশ বুঝিয়ে দিয়েছে, এটি কোনো আকস্মিক সাফল্য নয়; চার দিনের পরিকল্পিত, পরিণত ও দাপুটে ক্রিকেটের ফল।

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ২৩ বছর পর আবারও টেস্ট খেলতে নেমেছিল বাংলাদেশ। দুই দশকেরও বেশি সময় আগে ডারউইন ও কেয়ার্নসে যে দলটি অসহায় আত্মসমর্পণ করেছিল, সেই বাংলাদেশের কাছেই এবার নিজেদের মাঠে পরাস্ত হলো অস্ট্রেলিয়া। সফরকারীদের জন্য তাই এই জয় এক অর্থে অতীতের হতাশারও জবাব!

গল্পের শুরুটা হয়েছিল প্রথম দিনেই। ১৩ আগস্ট বাংলাদেশের পেসাররা যেন অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপের ওপর ঝড় বইয়ে দেন। দুই সেশন পেরোনোর আগেই অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস গুটিয়ে যায় দুইশ রানের নিচে। স্টিভ স্মিথ ছাড়া বলার মতো প্রতিরোধই গড়ে উঠতে পারেনি স্বাগতিকরা।

অবশ্য এরপর বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের সামনে ছিল আরও কঠিন পরীক্ষা। মিচেল স্টার্ক, প্যাট কামিন্স ও জশ হ্যাজলউড-বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম ভয়ংকর পেস আক্রমণের বিপক্ষে বাংলাদেশ কতটা টিকতে পারে, সেটিই ছিল বড় প্রশ্ন। কিন্তু সেই প্রশ্নেরও উত্তর এসেছে ব্যাট হাতে।

তানজিদ হাসান তামিম খেলেছেন ঐতিহাসিক এক সেঞ্চুরি। তার সঙ্গে নাজমুল হোসেন শান্ত ও মেহেদী হাসান মিরাজের কার্যকর ব্যাটিং বাংলাদেশের ইনিংসকে এনে দেয় শক্ত ভিত। অস্ট্রেলিয়ার ভয়ংকর পেস ত্রয়ীকে সামলে বাংলাদেশ তখন শুধু লড়ছেই না, বরং ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিচ্ছে।

দ্বিতীয় ইনিংসে অবশ্য ক্যামেরন গ্রিন প্রতিরোধ গড়ে অস্ট্রেলিয়াকে ম্যাচে ফেরানোর চেষ্টা করেন। দেশের মাটিতে সেঞ্চুরি করে স্বাগতিকদের লিডও এনে দেন তিনি। কিন্তু বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণ তখনও অটুট। বিশেষ করে মেহেদী হাসান মিরাজের ঘূর্ণিতে অস্ট্রেলিয়ার বড় লিডের আশা শেষ হয়ে যায়। ফলে বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান।

তারপরও ক্রিকেটে ছোট লক্ষ্য কখনো কখনো বড় চাপ হয়ে দাঁড়ায়। প্রথম ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান তানজিদ হাসান তামিম দ্বিতীয় ইনিংসে ফিরলেন শূন্য রানে। কিন্তু তাতে বাংলাদেশের জয় থামেনি। সাদমান ইসলাম ও মুমিনুল হক ঠান্ডা মাথায় বাকি পথ পাড়ি দিয়ে নিশ্চিত করেন ঐতিহাসিক জয়!

মাত্র ১৪.২ ওভারে ৫৭ রান তুলে নেয় বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টে দ্বিতীয় জয়-দুই ইতিহাস একই ম্যাচে লিখে ফেলল শান্তর দল।

আরও অবাক করার মতো বিষয়, কিছুদিন আগেই প্রস্তুতি ম্যাচে বাংলাদেশকে মাত্র ৫৪ রানে গুটিয়ে দিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। সেই স্মৃতি হয়তো স্বাগতিকদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছিল। কিন্তু মূল ম্যাচে বাংলাদেশ দেখিয়ে দিল, প্রস্তুতি ম্যাচের হিসাব আর ইতিহাস গড়ার দিনের হিসাব এক নয়।

ডারউইনের এই জয় তাই বাংলাদেশের ক্রিকেটে শুধুই আরেকটি টেস্ট জয় হয়ে থাকবে না। র‌্যাঙ্কিংয়ের ব্যবধান, প্রতিপক্ষের তারকা বোলিং আক্রমণ কিংবা নিজেদের অতীত রেকর্ড-কোনোটাকেই গুরুত্ব না দিয়ে বাংলাদেশ চার দিন ধরে যে ক্রিকেট খেলেছে, সেটিই এই জয়ের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো-বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে বহুদিনের যে অসম্ভব স্বপ্ন ছিল, ডারউইনে সেটিই বাস্তব হয়ে গেল। এবার আর প্রশ্ন নয়, বাংলাদেশ তৃতীয় দিন পর্যন্ত টিকবে কি না। বরং ইতিহাসের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়ার মাটিতেও তারা জিততে পারে, তাও দাপটের সঙ্গে!

সংক্ষিপ্ত স্কোর-

অস্ট্রেলিয়া: ১ম ইনিংস ১৯৮/১০ ও দ্বিতীয় ইনিংস ২৮৪/১০ (গ্র্রিন ১০৪, স্মিথ ৪৪, লাবুশেন ৩১, ক্যারি ৩০, স্টার্ক ১৮, লায়ন ১৫; মিরাজ ৫/৬৬, হাসান ৩/৫৬, তাসকিন ১/৬৬, তাইজুল ১/৫১, ইবাদত ০/৩৮)

বাংলাদেশ: ১ম ইনিংস ৪২৬/১০ ও ২য় ইনিংস ৫৭/১০ (মুমিনুল ৩০, সাদমান ২৫, তানজিদ ০; হ্যাজলউড ১/৫, স্টার্ক ০/১৫, লায়ন ০/২৩)।

ফল: বাংলাদেশ ৯ উইকেটে জয়ী।

মাচসেরা: হাসান মাহমুদ

You may also like

Leave a Comment