হবিগঞ্জ জেলার শিল্পাঞ্চলে ভয়াবহ গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। চাহিদার তুলনায় দীর্ঘদিন ধরে কম সরবরাহ করা হয়। বুধবার বিকেল থেকে জেলার অধিকাংশ শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এতে হবিগঞ্জ জেলার ছোট-বড় অর্ধশতাধিক কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। হঠাৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মসংস্থান ও রপ্তানি খাত নিয়ে দেখা দিয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা জানান, জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময় থেকেই গ্যাস সংকট প্রকট হতে শুরু করে। এতদিন চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ বা এক-চতুর্থাংশ গ্যাস দিয়ে কোনোমতে উৎপাদন চালিয়ে নেওয়া হলেও বুধবার থেকে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শতভাগ রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো। নির্ধারিত সময়ে বিদেশে পণ্য পাঠাতে না পারলে অর্ডার বাতিল হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের (প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ) মহাব্যবস্থাপক দীপক কুমার দেব জানান, পার্কটিতে প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক ও কর্মকর্তা কাজ করেন। বুধবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ থাকায় পার্কের সব কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।
একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে যমুনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কেও। পার্কটির মহাব্যবস্থাপক (প্রকৌশল) আবুল হোসেন জানান, তাদের ছয়টি কারখানার মধ্যে চারটি শতভাগ রপ্তানিমুখী। দৈনিক ১৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে কিছুদিন ধরে মাত্র ৩ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা হচ্ছিল। বুধবার রাত ১২টা থেকে সেই সরবরাহও বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে পল্লী বিদ্যুতের সহায়তায় সীমিত পরিসরে কিছু জরুরি যন্ত্রপাতি সচল রাখা হয়েছে।
তুলা ও সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও চরম সংকটে পড়েছে। এসএম স্পিনিংয়ের মহাব্যবস্থাপক আবুল বাশার জানান, গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় তাদের দৈনিক প্রায় ৩৮ হাজার মেট্রিক টন সুতা উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার ৬০০ মার্কিন ডলারের ক্ষতি হচ্ছে। অন্যদিকে ফারইস্ট স্পিনিং মিলের ম্যানেজার সুমন আহমেদ বলেন, গ্যাস না থাকায় তারা সোলার বিদ্যুৎ ও জাতীয় গ্রিডের সীমিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করছেন। তবে সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে পুরো শিল্পখাত মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে।
এদিকে স্কয়ার, ডেনিম, স্টার সিরামিক্সসহ বিভিন্ন বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদনও পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। অধিকাংশ কারখানা নিজস্ব ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করত। গ্যাস না থাকায় এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে উৎপাদন ও বিদ্যুৎ—দুই ক্ষেত্রেই বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি হয়েছে।
হবিগঞ্জের ১৭১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বিরাজ করছে উদ্বেগ। যমুনা পার্কের শ্রমিক আলী আকবর বলেন, “হাজার হাজার শ্রমিক এসব কারখানার আয়ের ওপর নির্ভরশীল। কারখানা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে পরিবার নিয়ে মানবেতর পরিস্থিতিতে পড়তে হবে।”
গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জালালাবাদ গ্যাস টি অ্যান্ড ডি সিস্টেম লিমিটেডের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. রুহুল করিম চৌধুরী বলেন, জাতীয় পর্যায়ে গ্যাসের সংকট দেখা দেওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে কমিয়ে দিতে হয়েছে। তবে আগামী তিন থেকে চার দিনের মধ্যে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
