শিপমেন্ট কিছুটা কমলেও ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক সরবরাহকারী হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। অফিশিয়াল তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন ক্রেতারা চীন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার ধারাবাহিকতায় এই অবস্থান ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে।
ইউএস অফিস অভ টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের (ওটেক্সা) তথ্য অনুসারে, জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত সময়কালে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮.১ শতাংশ কমে ৩.২৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে এই পতনের হার যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক পোশাক আমদানির বাজার সংকোচনের চেয়ে কম; দেশটির সামগ্রিক পোশাক আমদানি কমেছে ৯.৩ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শীর্ষ সরবরাহকারী হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে ভিয়েতনাম। যুক্তরাষ্ট্রে দেশটির রপ্তানি ১.৫ শতাংশ বেড়ে ৬.৩৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অন্যদিকে বৈশ্বিক রিটেইল সরবরাহ চেইনে দ্রুত পরিবর্তনের কারণে চীন থেকে মার্কিন বাজারে সরবরাহ ৪২.৮ শতাংশ কমে ২.৮০ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। মূলত মার্কিন শুল্ক ও উৎস বহুমুখীকরণ কৌশলের কারণেই এই পরিবর্তন ঘটছে। পোশাকের পরিমাণের দিক থেকেও চীনের সরবরাহ প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়া। যুক্তরাষ্ট্রে দেশ দুটির পোশাক রপ্তানি যথাক্রমে ৫.৫ শতাংশ ও ১৪.৯ শতাংশ বেড়েছে। আর ভারতের রপ্তানি কমেছে ২৬.৪ শতাংশ।
বাংলাদেশ যদিও বাজারে আগের অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে, তবে এসব পরিসংখ্যান বলছে, চীন থেকে চলে যাওয়া ক্রয়াদেশের বড় একটি অংশ বাংলাদেশ এখনো দখল করতে পারেনি। অথচ এক্ষেত্রে এ অঞ্চলের অন্যান্য প্রতিযোগী দেশ আরও দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।
তবে সর্বশেষ মাসিক তথ্যে কিছু আশাব্যঞ্জক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। চলতি বছরের দুর্বল শুরুর পর মার্কিন বাজারে চাহিদা আবার পুনরুদ্ধারের আভাস দিয়ে মে মাসে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৬ শতাংশ বেড়েছে। এর বিপরীতে ওই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক পোশাক আমদানি বেড়েছিল ২.৮ শতাংশ।
পোশাকের পরিমাণের দিক থেকে জানুয়ারি-মে সময়ে বাংলাদেশ ১.০৯ বিলিয়ন স্কয়ার মিটার ইক্যুইভ্যালেন্ট (এসএমই) পোশাক পাঠিয়েছে, যা আগের চেয়ে ৬.২ শতাংশ কম। তবে এই সময়ে প্রতি এসএমই পোশাকের গড় মূল্য ২ শতাংশ কমে ২.৯৯ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ বিশ্ববাজারে চাহিদা কম থাকা সত্ত্বেও রপ্তানিকারকরা মোটের ওপর পণ্যের দাম ধরে রাখতে পেরেছেন।
মূল্য ও পরিমাণ উভয় দিক থেকেই চীনের রপ্তানিতে নাটকীয় ধস নেমেছে। মার্কিন শুল্ক ও সোর্সিং বহুমুখীকরণের কারণে দ্রুত বাজার হিস্যা হারানোর ফলে চীনের রপ্তানি মূল্যের দিক থেকে প্রায় ৪৩ শতাংশ এবং পরিমাণের দিক থেকে প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে।
এর মধ্যে ইন্দোনেশিয়া বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দেশটির রপ্তানি মূল্যের দিক থেকে ৫.৪৯ শতাংশ এবং পরিমাণের দিক থেকে ১৩ শতাংশের বেশি বেড়েছে। অন্যদিকে মার্কিন বাজারে সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে উঠে এসেছে কম্বোডিয়া। মূল্যের দিক থেকে প্রায় ১৫ শতাংশ এবং পরিমাণের দিক থেকে ১৮ শতাংশ বেড়েছে দেশটির রপ্তানি।
মূল্য তুলনা:
চাহিদা কম থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির মূল্য স্থিতিশীল ছিল। অর্থাৎ ক্রয়াদেশ ধরে রাখার জন্য রপ্তানিকারকরা পণ্যের দাম খুব বেশি কমানোর পথে হাঁটেননি।
২০২৬ সালের জানুয়ারি-মে সময়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ শতাংশ কমে প্রতি এসএমই ২.৯৯ ডলার হয়েছে, যেখানে বৈশ্বিক গড় মূল্য ছিল ৩.১৪ ডলার।
ওটেক্সার তথ্য বলছে, চীন (১.৪৩ ডলার), পাকিস্তান (২.৫৯ ডলার) ও কম্বোডিয়ার (২.৯১ ডলার) চেয়ে বাংলাদেশ বেশি মূল্য ধরে রাখতে পেরেছে। তবে ভিয়েতনাম (৩.৩৯ ডলার), ভারত (৩.৪১ ডলার), হন্ডুরাস (৩.৬৪ ডলার), ইন্দোনেশিয়া (৩.৭৭ ডলার) ও মেক্সিকোর (৪.৪৫ ডলার) চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে।
প্রধান সরবরাহকারীদের মধ্যে চীনের ইউনিটের মূল্য সবচেয়ে কম ছিল, যা কম দামি ও বিপুল পরিমাণ পণ্যের প্রতি তাদের মনোযোগের বিষয়টি তুলে ধরে। অন্যদিকে মার্কিন বাজারের ভৌগোলিক নৈকট্য ও মূল্য সংযোজিত পোশাকের হিস্যা বেশি থাকার কারণে মেক্সিকো সর্বোচ্চ গড় মূল্য ধরে রেখেছে। বাংলাদেশের এই আপেক্ষিক স্থিতিশীল মূল্য কাঠামো বলছে, রপ্তানি কমার মূল কারণ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়, বরং সরবরাহের পরিমাণ কমে যাওয়া।
