ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনকে কেন্দ্র করে সরকার ও ব্যাংক উদ্যোক্তাদের মধ্যে মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে মালিকানা কাঠামো, শেয়ার ধারণ এবং ভোটাধিকার নিয়ে দুপক্ষের অবস্থান ভিন্ন। গতকাল বুধবার এই বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সমাধানে পৌঁছানো যায়নি, ফলে বৈঠক অমীমাংসিতই শেষ হয়েছে। উভয় পক্ষ পরবর্তী এক দফা বৈঠকের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
গতকাল আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উদ্যোগে, প্রতিষ্ঠান সচিব নাজমা মোবারেকের সভাপতিত্বে একটি নীতিনির্ধারণী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সরকার পক্ষ চায় এক ব্যক্তি বা পরিবার একাধিক ব্যাংকের উল্লেখযোগ্য মালিক না হতে পারে। মালিকানা কেন্দ্রিকতা কমানো এবং ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা ও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য।
অন্যদিকে ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) মালিকানা সীমাবদ্ধতার বিরোধী। বিএবির পক্ষে সিটি ব্যাংকের এমডি ও সিইও মাসরুর আরেফিন বলেন, মালিকানা সীমিত করলে বিনিয়োগ কমে যাবে এবং দুর্বল ব্যাংকের মূলধন সংকট বৃদ্ধি পাবে। তবে পরিচালক নির্বাচনে কিছু ছাড় দেওয়ার বিষয়ে বিএবি সম্মত।
প্রস্তাবিত নতুন ধারা
ব্যাংক কোম্পানি আইন ২০২৫-এর ১৪খ ধারার সংশোধনীতে নতুন তিনটি উপধারা যুক্ত করা হচ্ছে : উপধারা (৩) : একই ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা পরিবারের সদস্যরা একই সময়ে একাধিক ব্যাংকের উল্লেখযোগ্য শেয়ার রাখতে পারবে না। একক বা যৌথ মালিকানা উভয়ই অন্তর্ভুক্ত। উপধারা (৪) : যদি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান একটি ব্যাংকের মোট শেয়ারের ২% বা বেশি ধারণ করে, তবে একই সময়ে অন্য ব্যাংকের ২% বা বেশি শেয়ার রাখতে পারবে না। উপধারা (৫) : সরকার, অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ও কৌশলগত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ছাড়া কেউ ব্যাংকের ৫%-এর বেশি শেয়ার রাখলেও ভোটাধিকার সর্বোচ্চ ৫% সীমিত থাকবে।
বর্তমান আইনে একাধিক ব্যাংকের শেয়ার রাখার কোনো নিষেধ নেই। শেয়ার ধারণের সর্বোচ্চ সীমা সাধারণত ১০% এবং ‘এক শেয়ার, এক ভোট’ নীতি কার্যকর।
বিএবির সুপারিশ
বিএবি পরিবার সংজ্ঞা সীমিত করে শেয়ারধারণের সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। তারা চায় পরিবার বলতে শুধু স্বামী-স্ত্রী ও
নির্ভরশীলদের বোঝানো হোক এবং একই পরিবারের শেয়ার সীমা ২৫% পর্যন্ত বাড়ানো হোক। এছাড়া পরিচালকের সংখ্যা এবং স্বতন্ত্র পরিচালকের বিষয়ে বিধিনিষেধ শিথিল করার সুপারিশ করেছে।
বিএবি আন্তর্জাতিক তুলনাও উল্লেখ করেছে। ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকায় পরিবারের সংজ্ঞা সীমিত এবং মালিকানা নিয়ন্ত্রণে নমনীয়তা আছে। ভারতে পরিবার বলতে স্বামী-স্ত্রী বা হিন্দু অবিভক্ত পরিবার। পাকিস্তানে স্বামী-স্ত্রী, নির্ভরশীল বংশধর ও নির্ভরশীল ভাইবোন। শ্রীলংকায় পরিবার শুধু স্বামী-স্ত্রী বা নির্ভরশীল সন্তান।
শেয়ারধারণ ও ভোটাধিকার বিতর্ক
প্রস্তাবিত আইনে ৫%-এর বেশি শেয়ার থাকলেও ভোটাধিকার ৫% সীমিত করার প্রস্তাব রয়েছে। বিএবি এই প্রস্তাব বাতিলের দাবি জানিয়েছে, কারণ বর্তমান ‘এক শেয়ার, এক ভোট’ নীতি মালিকানার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে।
পরিচালনা পর্ষদ ও স্বতন্ত্র পরিচালক
বর্তমান আইনে একই পরিবারের সর্বোচ্চ তিনজন পরিচালক থাকতে পারেন, প্রস্তাবিত আইনে দুজন করা হয়েছে। মোট পরিচালকের সংখ্যা কমিয়ে ১৫ এবং অর্ধেক স্বতন্ত্র করার প্রস্তাব রয়েছে। বিএবি মনে করে, শেয়ার মালিকানা ও পরিচালনার বিষয় আলাদা এবং এই প্রস্তাব শেয়ারহোল্ডারদের বাস্তব নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করবে।
স্বতন্ত্র পরিচালকের ক্ষেত্রেও মতবিরোধ রয়েছে। বর্তমানে মোট পরিচালকের সংখ্যা সর্বোচ্চ ২০ জন। এর মধ্যে স্বতন্ত্র পরিচালক ন্যূনতম ২ থেকে সর্বোচ্চ ৩ জন। প্রস্তাবিত আইনে মোট পরিচালক ১৫ জন এবং এর অর্ধেক স্বতন্ত্র করার কথা বলা হয়েছে। বিএবি বলছে, এতে শেয়ারহোল্ডারদের বাস্তব নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হবে।
অন্য ব্যাংকের শেয়ার ও বিনিয়োগ প্রভাব
প্রস্তাবিত আইনে একাধিক ব্যাংকে উল্লেখযোগ্য শেয়ার রাখার সীমা ২% নির্ধারণ করা হয়েছে। বিএবি বলেছে, এতে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ কমবে এবং দুর্বল ব্যাংকের মূলধন সংগ্রহ কঠিন হবে।
আলোচনার ভবিষ্যৎ
সরকার মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ আলাদা করতে চায়। ব্যাংক উদ্যোক্তারা মালিকানায় নমনীয়তা চাইছে। উভয় পক্ষই ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতার কথা বলছে, তবে কৌশল ও পথনির্ধারণে মতৈক্য নেই। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আসবে।
সাংঘর্ষিক ধারা
ধারা ১২০ অনুযায়ী সরকারি গেজেটে বিধি প্রণয়ন করা সংক্রান্ত ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে রাখা হয়েছে। তবে মন্ত্রণালয় বলছে, বাংলাদেশ ব্যাংক শতভাগ সরকারি প্রতিষ্ঠান না হওয়ায় এই ক্ষমতা প্রয়োগ করা সাংঘর্ষিক। তাই সংশোধন প্রয়োজন।
