আসন সমঝোতা না হওয়া, নতুন তিন দলকে জোটে আনার ক্ষেত্রে অন্যদের মতামত না নেওয়া, নিজেদের মধ্যে চাওয়া-পাওয়ার নিয়ে বৈঠক না করাসহ নানা কারণে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনসহ ১১ দলীয় জোটের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়ছে বলে। বাড়ছে ক্ষোভ ও হতাশা। দলগুলোর জোট সংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রার্থিতার বৈধ, অবৈধ এবং আপিল ইস্যুতে এখন জোটের শরিক দলগুলো ব্যস্ত সময় পার করছে। তার মধ্যেও বেশিরভাগ দল চায় জামায়াতের সঙ্গে বৈঠক করতে। কিন্তু জামায়াতের সঙ্গে ব্যাটে-বলে মিলছে না বলে বৈঠক হয়ে উঠছে না।
জোট নেতারা বলেছেন, শুধু জামায়াত নয়, ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত মজলিসের সঙ্গেও আসন সমঝোতার ইস্যুতে বোঝাপড়ার অভাব আছে। কোনো অভিযোগ নেই জোটে আসা নতুন তিন দলÑ এনসিপি, এলডিপি ও এবি পার্টির। অবশ্য জামায়াতে ইসলামী দলের নেতারা মনে করেন, আসন সমঝোতার বিষয়টি প্রার্থিতা প্রত্যাহার (২০ জানুয়ারি) পর্যন্ত সময় আছে। আর অন্য যেসব বিষয়ে অভিযোগ আছে, তাও আলোচনার মধ্য দিয়ে সমাধানের সুযোগ আছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সমঝোতার আলোচনা চলার মধ্যেই জামায়াত ২৭৬টি আসনে এবং ইসলামী আন্দোলন ২৬৮টি আসনে প্রার্থী দিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেয়। পাশাপাশি এনসিপি ৪৪টি, এবি পার্টি ৫৩টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৯৪টি, খেলাফত মজলিস ৬৮টি, এলডিপি ২৪টি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ১১টি, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি ছয়টি, জাগপা তিনটি এবং বিডিপি দুইটি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়।
আট দলের সর্বশেষ বৈঠকের পর ইসলামী আন্দোলনকে ৩৫ থেকে ৪০টি, এনসিপিকে ৩০টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে ১১টি, খেলাফত মজলিসকে তিনটি, এবি পার্টিকে তিনটি, এলডিপিকে দুইটি এবং বিডিপিকে দুইটি আসন ছাড়ের কথা বলে জামায়াত ইসলামী। কিন্তু জোটে নতুন তিন দলকে আনা এবং আসন ছাড়ের ইস্যুকে ভালোভাবে নেয়নি জোটের নেতারা।
জোটের বিভিন্ন দলের নেতারা মনে করেন, কোন আসনে কোন প্রার্থী দেওয়া দরকার, কোন দলের প্রার্থী দিলে জয়ী হবেন- এ বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রার্থী দেওয়া হয়নি। গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বিশেষ দলকে। এনসিপি, এলডিপি ও এবি পার্টিকে মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে জামায়াত নিজের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছে।
ইসলামী আন্দোলনের একজন নেতা আমাদের সময়কে বলেন, জোট বা নির্বাচনী সমঝোতার ধারণাটা প্রথম নিয়ে আসে ইসলামী আন্দোলন। তারপর এর সঙ্গে যোগ দেয় অন্যান্য দল। এক পর্যায়ে জামায়াত আসে। এখন তাদের দলের প্রার্থীর জন্য জামায়াতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করতে হয়, এটা দুঃখজনক।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সহকারী মহাসচিব মাওলানা আহমদ আবদুল কাইয়ুম আমাদের সময়কে বলেন, আমরা চাই সঠিক সিদ্ধান্তে জোট এগিয়ে যাক। একে অন্যেরা মধ্যে বোঝাপড়া তৈরি হোক।
ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের ভাষ্য, জোটের মূল ভাষ্য ছিল জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে আসন ছাড়ের কথা। যার দলে বেশি জনপ্রিয় নেতা তাদের তত বেশি আসন দেওয়া। কিন্তু সেভাবে দেওয়া হয়নি। জামায়াতের কথায় চলতে হচ্ছে জোটকে, সবার সম্মতিতে নয়।
অন্যদিকে জামায়াতের ভাষ্য, ইসলামী আন্দোলন সমঝোতার পথে না হেঁটে অবাস্তব সম্মত আসন চাইছে। ফলে জোটের সমঝোতার আলোচনা আলোর মুখ দেখছে না। জামায়াত দূরত্ব নয়, সমঝোতা চায়।
এ বিষয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ গণমাধ্যমকে বলেন, সমঝোতার সময় চলে যায়নি। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার পর্যন্ত সময় আছে। তার আগেই সমঝোতা চূড়ান্ত করার চেষ্টা আছে।
সমঝোতা না হলে জোট ছাড়বেন কি নাÑ এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসলামী আন্দোলনের আমির সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম আমাদের সময়কে বলেন, জোট ছাড়ার প্রশ্ন নাই। ইসলাম, দেশ এবং মানবতার কথা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত আসুক, এটা প্রত্যাশা করেন তিনি।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, আসন বণ্টন নিয়ে আগের সংকট পুরোপুরি কাটেনি। সমঝোতা না হওয়া কিছু আসনে সব দলের সম্মিলিত জরিপ করার কথা ছিল, সেটি এখনও হয়নি। সব মিলিয়ে আসন সমঝোতার বিষয়টি চূড়ান্ত হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। তবে সবার মধ্যে নমনীয় মনোভাব দেখা গেছে। সমঝোতার আলোচনা তিন-চার দিনের মধ্যে একটা পর্যায়ে পৌঁছাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জোটের আরেক শরিক খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমদ আব্দুল কাদের আমাদের সময়কে বলেন, আমাদের দলের আসন নিয়ে বাস্তব সমস্যা তৈরি হয়েছে। আমরা এফেক্টেড হচ্ছি। নতুন করে যুক্ত হওয়া দলগুলোর জন্য যেসব আসনে সমঝোতা করা হয়েছে, সে বিষয়েও সবাইকে অবগত বা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। কিছু আসনে এমন প্রার্থীর নাম সামনে আসছে, যারা স্থানীয়ভাবে পরিচিত নন, অথচ নিজ নিজ এলাকায় আগে থেকেই শক্ত ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থী রয়েছে। এতে মাঠপর্যায়ে বিভ্রান্তি ও অস্বস্তি তৈরি হচ্ছে।
আহমদ আব্দুল কাদের বলেন, আমাদের এলাকায় একজন নারী প্রার্থীকে ডাকার কথা শোনা যাচ্ছে, যিনি এখানে অপরিচিত। অথচ আমাদের প্রার্থী খুব ভালো এবং শক্ত অবস্থানে আছে। এসব বিষয় নিয়ে আমরা কথা বলছি এবং প্রয়োজনে সামনে অবস্থান স্পষ্ট করব।
জোটের সঙ্গে বৈঠক প্রসঙ্গে তিনি জানান, প্রত্যাশা থাকলেও নিয়মিত বৈঠক হচ্ছে না। আমরা আশা করছি কথা হবে। জোটের ভেতরে কিছু বিষয় আছে; জামায়াতের সঙ্গে সমন্বয়, অন্য দলগুলোর সঙ্গেও আলোচনাÑ এগুলো করে তারপর সবাই মিলে বসতে হবে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান সম্ভব এবং দলগুলো শেষ পর্যন্ত সমঝোতায় পৌঁছাবে।
এদিকে জোটে আসা সর্বশেষ দল এনসিপি, এলডিপি ও এবি পার্টি আসন সমঝোতা নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করতে শোনা যায়নি। তবে তাদের সঙ্গে জামায়াত ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে এখনও আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়নি বলে জানা গেছে। আগের আট দলের সঙ্গে তাদের অভিজ্ঞতা কেমন হবে, তা আগামী দিনেগুলোতে বোঝা যাবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব অল্প কথায় আমাদের সময়কে বলেন, জোটের সঙ্গে আমাদের কোনো দূরত্ব নেই।
