Home আন্তর্জাতিকযুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভ প্রতিবাদ

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভ প্রতিবাদ

by The Desh Bangla
০ comments

ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটকের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের ভেতর ও বাইরে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘ভেনেজুয়েলা চালানো’র ঘোষণায় সৃষ্টি হয়েছে ক্ষোভ। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তোলা হয়েছে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ। তেলের স্বার্থে যুদ্ধ চালানো হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এদিকে ভেনেজুয়েলায় অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব জানিয়েছে তারা কারও উপনিবেশ হবে না। আর ট্রাম্প জানিয়েছেন, কথা শুনলে সেখানে আর সেনা পাঠানো হবে না। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল রূপ নিচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে নিয়ে আসার ঘোষণার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন, নিউইয়র্ক, বোস্টন, মিনিয়াপোলিস, লস অ্যাঞ্জেলেস, লাস ভেগাসসহ বিভিন্ন শহরে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। হোয়াইট হাউসের

সামনে শতাধিক মানুষ জড়ো হয়ে ‘নো ব্লাড, নো অয়েল’সহ যুদ্ধবিরোধী স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড-ব্যানার হাতে বিক্ষোভ করেন। নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ারেও একই ধরনের প্রতিবাদ দেখা যায়। বিক্ষোভকারীদের কারও কারও হাতে ভেনেজুয়েলার পতাকা ছিল।

গত শনিবার ভোরে কারাকাসে মার্কিন সামরিক অভিযানের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ভেনেজুয়েলায় শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত দেশটি ‘চালাবে’ যুক্তরাষ্ট্র। তিনি বলেন, ‘নিরাপদ, সঠিক ও বিচক্ষণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর সম্ভব না হওয়া পর্যন্ত আমরা দেশটি পরিচালনা করব।’ ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানান, মাত্র চার দিন আগে তিনি এই অভিযানের অনুমোদন দিয়েছিলেন।

এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটনে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বামপন্থি স্বতন্ত্র সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ট্রাম্পের পদক্ষেপকে ‘নগ্ন সাম্রাজ্যবাদ’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি আন্তর্জাতিক আইনের নির্লজ্জ লঙ্ঘন। সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি সতর্ক করেন, এই দৃষ্টান্ত বিশ্বের যে কোনো দেশকে অন্য দেশে হামলা, সম্পদ দখল কিংবা সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা করার ‘সবুজ সংকেত’ দিতে পারে। স্যান্ডার্স ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের তুলনা করেন ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের সঙ্গে।

একই সুরে সমালোচনা করেছেন নিউইয়র্ক সিটির নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি। তিনি ভেনেজুয়েলার ওপর একতরফা আক্রমণকে ‘যুদ্ধের শামিল’ এবং আন্তর্জাতিক ও ফেডারেল আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেন। মামদানি বলেন, শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের এই নগ্ন আকাক্সক্ষা শুধু বিদেশেই নয়, সরাসরি নিউইয়র্কবাসীর ওপরও প্রভাব ফেলবে। কারণ শহরটিতে ভেনেজুয়েলার দশ হাজারের বেশি মানুষ বসবাস করেন।

সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসও ট্রাম্পের সামরিক হস্তক্ষেপকে ‘অবৈধ ও অবাস্তব’ বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তার মতে, এই অভিযান গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য নয়, বরং তেলের নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষার ফল। এতে ভেনেজুয়েলা ও পুরো অঞ্চল আরও অস্থিতিশীল হবে এবং মার্কিন সেনাদের ঝুঁঁকি বাড়বে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তেলের স্বার্থে এই অভিযান- এমন অভিযোগ তুলেছেন ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান জ্যাক অচিনক্লজ। সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘এটা তেলের জন্য রক্তপাত। এর সঙ্গে মাদক পাচারের কোনো সম্পর্ক নেই।’ তার দাবি, বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলের মজুদ ভেনেজুয়েলায়, আর ট্রাম্প প্রশাসন মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর স্বার্থরক্ষা করতেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে। তিনি শেভরনের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার তেল ব্যবহারের চুক্তির প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ মাদুরোর বিরুদ্ধে নারকো-টেররিজম ও মাদক পাচারের অভিযোগে মামলা দায়ের করেছে। তবে কারাকাস এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। বর্তমানে মাদুরোকে নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন গণমাধ্যম।

মাদুরোর অনুপস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে উপ-রাষ্ট্রপতি দেলসি রদ্রিগেজকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দায়িত্ব নিয়েই তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া বার্তা দিয়ে বলেন, ভেনেজুয়েলা কখনও কারও দাসত্ব করবে না এবং কোনো সাম্রাজ্যের উপনিবেশ হবে না। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে তিনি মাদুরোকে ‘একমাত্র বৈধ রাষ্ট্রপতি’ হিসেবে উল্লেখ করে তার ও তার স্ত্রীর অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানান।

তবে এই দাবির বিপরীতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, দেলসি রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া অনুযায়ী কাজ করলে ভেনেজুয়েলায় সরাসরি মার্কিন সেনা মোতায়েনের প্রয়োজন হবে না। ট্রাম্পের দাবি, তিনি ইতোমধ্যে রদ্রিগেজের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছেন এবং তিনি পরিস্থিতি ‘বুঝতে পারছেন’। যদিও দেলসি রদ্রিগেজ প্রকাশ্যে এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে মাদুরোর প্রতি আনুগত্য পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

সব মিলিয়ে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযান শুধু একটি দেশের রাজনৈতিক সংকট নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, তেল-রাজনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে ঘিরে এক বহুমাত্রিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ সেই অসন্তোষেরই প্রকাশ, যা সামনে আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

You may also like

Leave a Comment