Home রাজনীতিবিএনপির চেয়ারম্যান হলেন তারেক রহমান

বিএনপির চেয়ারম্যান হলেন তারেক রহমান

by Akash
০ comments

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন তারেক রহমান। গতকাল শুক্রবার রাতে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি এ দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তারেক রহমান চেয়ারম্যান হলেও অপেক্ষা ছিল শুধু ঘোষণার। সর্বশেষ গতকাল রাতে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তাকে এ পদে আসীন করার সিদ্ধান্ত হয়।

প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ভিত্তিহীন মামলায় দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার ও কারাবন্দি করার পর দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। গত ৩০ ডিসেম্বর বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালের পর বিএনপির গঠনতন্ত্রের ৭ (গ) ধারা মোতাবেক দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের কর্তব্য, ক্ষমতা ও দায়িত্বের উপধারা ৩ অনুযায়ী চেয়ারম্যান হন তারেক রহমান। সেখানে উল্লেখ রয়েছে, যে কোনো কারণে চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হলে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান বাকি মেয়াদের জন্য চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন এবং গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরবর্তী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি চেয়ারম্যানের দায়িত্বে বহাল থাকবেন।

গতকাল রাতে স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গুলশান কার্যালয়ের সামনে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপির গঠনতন্ত্রের বিধান অনুসারে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

স্থায়ী কমিটির এ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন তারেক রহমান। বৈঠকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়াও স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম ও এজেডএম জাহিদ হোসেন উপস্থিত ছিলেন।

জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার বড় সন্তান তারেক রহমান ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজে প্রাথমিক পড়াশোনা শেষে করে আশির দশকে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন। বিএনপির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে খালেদা জিয়াসহ দুই ছেলে তারেক রহমান ও প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোকে বন্দি করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। স্বৈরশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তারেক রহমানও তার মায়ের সঙ্গে রাজপথে নামেন। এ অবস্থায় ১৯৮৮ সালে বগুড়া জেলা বিএনপির গাবতলী উপজেলা শাখা সদস্য হিসেবে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে সক্রিয় হন।

এরশাদের পতনের পর অনুষ্ঠিত ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে তারেক রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সে সময় খালেদা জিয়া যে পাঁচটি আসনে নির্বাচন করেছিলেন, তারেক রহমান সেগুলোর দেখভাল করেন। ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার নেপথ্যেও অনস্বীকার্য ভূমিকা রাখেন তারেক রহমান। পুরস্কারস্বরূপ ২০০২ সালের ২২ জুন দলে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদ সৃষ্টি করে তারেক রহমানকে ওই পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর থেকে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা তার বিরুদ্ধে একের পর এক ষড়যন্ত্র আঁটতে থাকে; তার বিরুদ্ধে ছড়ানো হয় নানা প্রোপাগান্ডা। এহেন ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে যুক্ত হয় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বও। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের মেয়াদের শেষ পর্যায়ে আওয়ামী লীগ তুমুল রাজনৈতিক সংঘাত-সহিংসতা ছড়ায়। প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে লগি-বৈঠা নিয়ে রাজপথে ভিন্নমতাবলম্বীদের হত্যা করে। এমতাবস্থায় ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে সেনা

সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। ওয়ান-ইলেভেন নামে এই সরকার সমধিক পরিচিত। এ সরকারের সময়ে দুর্নীতির মিথ্যা অভিযোগ সাজিয়ে রাজধানীর ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর তাকে রিমান্ডে নিয়ে চালানো হয় চরম নির্যাতন। নির্যাতনে তার মেরুদণ্ড ভেঙে যায়। এভাবে ১৮ মাস কারাবন্দি থাকার পর, ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আদালতের নির্দেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনের উদ্দেশে স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও শিশুকন্যা জাইমা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ঢাকা ছাড়েন। সেখান থেকেই অব্যাহতভাবে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে এবং পরবর্তীকালে স্বৈরাচার হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে থাকেন। এরই ফলশ্রুতিতে অবসান ঘটে দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের। এরপর গত ২৫ ডিসেম্বর, দীর্ঘ ১৭ বছর তিন মাস ১৫ দিনের নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফেরেন তিনি।

২০০১ সালে তারেক রহমান দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর সংগঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। দলের তৃণমূলে তার নেতৃত্বেই যোগাযোগ সুদৃঢ় হয়। দলের সব পর্যায়ে নেতা নির্বাচনে গণতান্ত্রিক পন্থা বেছে নেন তারেক রহমান। তার এমন পদক্ষেপ দলকে কুক্ষিগত করে রাখার অপচেষ্টায় রত গুটিকয়েক নেতা মেনে নিতে পারেননি। এ অংশটিও দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তারেক রহমানের রাজনীতি ধ্বংসের অপচেষ্টা চালায়। তার বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা ছড়াতে কিছু গণমাধ্যমকেও সঙ্গে নেওয়া হয়। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে নানাভাবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কান ভারী করা হতো। যদিও গত ১৭ বছরে এসব কিছুই পরিষ্কার হয়ে যায়। এ সময়কালে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে কোনো অপকর্মের ন্যূনতম নজিরও উপস্থাপন করা যায়নি।

২০০৯ সালে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলে তারেক রহমানকে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালে মিথ্যা-ভিত্তিহীন মামলায় দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করা হলে দলের গণতন্ত্র অনুযায়ী তারেক রহমানকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয়। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের মতো ২০১৮ সালের নির্বাচনেও তারেক রহমানের প্রতিটি পদক্ষেপ দারুণভাবে সফল হয়। এর বিপরীতে পরাজয়ের শঙ্কায় ওই বছর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দিনের ভোট আগের রাতে করতে বাধ্য হয় শেখ হাসিনা সরকার। যা ‘রাতের ভোট’ হিসেবে দেশ-বিদেশে পরিচিতি পায়। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জনে দেশবাসীর প্রতি তারেক রহমানের আহ্বানে ব্যাপক সাড়া মেলে। ওই নির্বাচনে দেশের ৫ শতাংশ মানুষও ভোট দিতে কেন্দ্রে যাননি।

গত ১৭ বছর তারেক রহমানের রাজনীতি বাধাগ্রস্ত করতে বিচার বিভাগকেও অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে হাসিনার সরকার। একপর্যায়ে তারেক রহমানের বক্তব্য-বিবৃতি প্রচার আদালতের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। অনন্যোপায় তারেক রহমান সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় হন এবং ভার্চুয়ালি দলীয় কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন। এ প্রসঙ্গে বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দের ভাষ্য, অল্পদিনের মধ্যে একদিকে তৃনমূলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, অন্যদিকে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কুশলী নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন তারেক রহমান।

উত্তরবঙ্গ সফর স্থগিত

গতকাল স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তারেক রহমানের উত্তরবঙ্গ সফর আপাতত স্থগিত করা হয়েছে বলে জানান দলের মহাসচিব। বলেন, পরবর্তীকালে সফরের নতুন সময়সূচি জানানো হবে। বৈঠকে দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও দলের করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয় বলেও দলীয় সূত্রের খবর।

You may also like

Leave a Comment