Home অর্থনীতিবড় চাপে পড়বে অর্থনীতি

বড় চাপে পড়বে অর্থনীতি

by The Desh Bangla
০ comments

নির্ধারিত সময়ের আগেই সরকারি চাকরিজীবীদের সুখবর দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত বেতন কমিশন; সুপারিশ করেছে আড়াই গুণ পর্যন্ত বেতন বাড়ানোর। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে করে দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে।

বেতন কমিশনের প্রধান জাকির আহমেদ খান গতকাল বুধবার বিকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় নতুন বেতন-ভাতার সুপারিশ প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দিয়েছেন। এ সময় অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরী, অর্থসচিব খায়রুজ্জামান মজুমদারসহ কমিশনের সব পূর্ণকালীন ও খণ্ডকালীন সদস্য উপস্থিত ছিলেন। কমিশনের প্রতিবেদন দাখিলের নির্ধারিত শেষ তারিখ ছিল ২০২৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি।

প্রতিবেদনে বেতন বৃদ্ধির বিষয়ে কমিশন সরকারি কর্মচারীদের জন্য ২০টি স্কেলে বেতন সুপারিশ করেছে। সর্বনিম্ন বেতন স্কেল ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে এবং সর্বোচ্চ বেতন স্কেল ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। কমিশনের কাজের প্রশংসা করে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘এটা মস্ত বড় একটা কাজ হয়েছে। মানুষ বহুদিন ধরে এর জন্য অপেক্ষা করছে। আউটলাইন দেখে বুঝলাম, এটি খুবই সৃজনশীল কাজ হয়েছে।’

আর কমিশনপ্রধান জাকির আহমেদ খান বলেন, গত এক দশকে বৈশ্বিক ও জাতীয় পর্যায়ে অর্থনীতির প্রায় সব সূচকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সময়োপযোগী ও যথাযথ বেতন কাঠামো নির্ধারণ না হওয়ায় সরকারি কর্মচারীদের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সুস্পষ্ট কার্যপরিধি নির্ধারণপূর্বক বিদ্যমান বেতন, ভাতা ও অন্য সুবিধাদি পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে কমিশন কাজ করে। তিনি বলেন, প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করতে হলে প্রয়োজন হবে এক লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের ব্যয় করতে হবে এক লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। আর বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা জানান, প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে বিশাল অঙ্কের টাকা লাগবে। সেটির সংস্থান নিয়ে অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হবে। একদিকে রাজস্ব আহরণের ওপর চাপ তৈরি হবে, অন্যদিকে মূলস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ।

গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র?্যাপিড) চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক আমাদের সময়কে বলেন, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করতে বড় ধরনের অর্থের প্রয়োজন হবে। এ অর্থের সংস্থান কীভাবে হবে, কারণ রাজস্ব আহরণের গতি-প্রকৃতি দেখে মনে হয় না হঠাৎ করে বড় ধরনের রাজস্ব আয় হবে। অন্যদিকে এখনো মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি রয়েছে। ফলে একসঙ্গে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করতে গেলে বড় ধরনের চাপ পোহাতে হবে। অন্যদিকে সরকারি বেতন-ভাতা বৃদ্ধি হলে বেরসরকারি খাতেও বেতন বাড়ানোর চাপ থাকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম (শহীদুল জাহীদ) আমাদের সময়কে বলেন, নতুন বেতন কাঠামো সময়ের দাবি। তবে এটি যৌক্তিক পর্যায়ে হলে ভালো হয়। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করতে গেলে রাজস্ব আহরণের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে। এ ছাড়াও মুদ্রাস্ফীতি ও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি হবে। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর সুফল মিলবে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত পরিচালক (রিসার্চ) তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, এর আগেও সরকার যখন বেতন কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছিল তখনও আমরা সেটিকে যৌক্তিক বলে মনে করেছি। কিন্তু প্রশ্ন ছিল এতে সরকারের দক্ষতা বাড়বে কিনা? যদি সরকারের আকার কমিয়ে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বেতন বাড়ানো হতো তাহলে কোনো সমস্যা থাকত না। কিন্তু ঋণ করে বেতন বাড়ালে, বাড়বে মূল্যস্ফীতি এতে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ সক্ষমতা কমবে। সরকার বিভিন্ন খাতে যে অর্থ বরাদ্দ করতে পারে না, তা থেকে বের হওয়ার পথ আরও লম্বা হবে। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো যে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, তা বাস্তবায়ন কঠিন হবে।

এ অবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকার তার মেয়াদের শেষ সময়ে এসে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়াটা মোটেও যৌক্তিক হবে না। নির্বাচনের ঠিক কয়েক দিন আগে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা করা উচিত। কারণ সরকারের এ সিদ্ধান্তের কারণে যে অভিঘাত তৈরি হবে তার কোনোটাই বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর বর্তাবে না। কিন্তু পরবর্তী সময় যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় আসবে তাদের ওপর এ দায়টা পড়বে। এখন রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত হবে আগামী নির্বাচনে তাদের ইশতিহারে এটি যুক্ত করা, জনগণের সামনে তুলে ধরা। জনগণ যদি তাদের সমর্থন দেয় তাহলে সেটি ভূতাপেক্ষ হিসেবেও (হতে পারে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে) কার্যকর করতে পারে।

কমিশনের প্রতিবেদনে নতুন নতুন প্রস্তাবনার মধ্যে রয়েছে সরকারি কর্মচারীদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা প্রবর্তন, পেনশন ব্যবস্থার সংস্কার, সরকারি কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড পুনর্গঠন, সার্ভিস কমিশন গঠন, বেতন গ্রেড ও স্কেলের যৌক্তিক পুনর্বিন্যাস, সরকারি দপ্তরসমূহে ভাতাগুলো পর্যালোচনার জন্য কমিটি গঠন এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে মানবসম্পদ উন্নয়ন।

প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে, কোনো কর্মচারীর প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে, বেতন কমিশন সংশ্লিষ্ট মাসিক ২,০০০ (দুই হাজার) টাকা ভাতা প্রদানের সুপারিশ করেছে, শর্ত থাকে যে, সব ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ দুজন সন্তান এই সুবিধা পাবে।

এতে আরও বলা হয়েছে, টিফিন ভাতার বর্তমানে প্রচলিত বিধানাবলি অব্যাহত থাকবে, তবে কমিশন ভাতার হার বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে। ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য বর্তমানে প্রচলিত মাসিক টিফিন ভাতা ২০০ টাকার স্থলে ১,০০০ (এক হাজার) টাকা করা যেতে পারে।

কত টাকা থেকে কত টাকা বাড়ানোর সুপারিশ

২০ নম্বর গ্রেডে ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা, ১৯ গ্রেডে ৮ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ২০ হাজার ৫০০ টাকা, ১৮ গ্রেডে ৮ হাজার ৮০০ টাকা থেকে ২১ হাজার টাকা, ১৭ গ্রেডে ৯ হাজার টাকা থেকে ২১ হাজার ৪০০ টাকা, ১৬ গ্রেডে ৯ হাজার ৩০০ টাকা থেকে ২১ হাজার ৯০০ টাকা, ১৫ গ্রেডে ৯ হাজার ৭০০ টাকা থেকে ২২ হাজার ৮০০ টাকা, ১৪ গ্রেডে ১০ হাজার ২০০ টাকা থেকে ২৩ হাজার ৫০০ টাকা, ১৩ গ্রেডে ১১ হাজার টাকা থেকে ২৪ হাজার টাকা, ১২ গ্রেডে ১১ হাজার ৩০০ টাকা থেকে ২৪ হাজার ৩০০ টাকা, ১১ গ্রেডে ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ২৫ হাজার টাকা, দশন গ্রেডে ১৬ হাজার টাকা থেকে ৩২ হাজার টাকা, নবম গ্রেডে ২২ হাজার টাকা থেকে ৪৫ হাজার ১০০ টাকা, অষ্টম গ্রেডে ২৩ হাজার টাকা থেকে ৪৭ হাজার ২০০ টাকা, সপ্তম গ্রেডে ২৯ হাজার টাকা থেকে ৫৮ হাজার টাকা, ষষ্ঠ গ্রেডে ৩৫ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৭১ হাজার টাকা, পঞ্চম গ্রেডে ৪৩ হাজার টাকা থেকে ৮৬ হাজার টাকা, চতুর্থ গ্রেডে ৫০ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ টাকা, তৃতীয় গ্রেডে ৫৬ হাজর ৫০০ টাকা থেকে ১ লাখ ১৩ হাজার টাকা, দ্বিতীয় গ্রেডে ৬৬ হাজার থেকে ১ লাখ ৩২ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডে বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার সুপারিশ করেছে কমিশন।

You may also like

Leave a Comment