নির্বাচন এলেই রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে নানা প্রতিশ্রুতি উঠে আসে। কিন্তু দেশের মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক নারী হলেও তাদের বাস্তব চাহিদা ও নিরাপত্তা কতটা গুরুত্ব পায়- সে প্রশ্ন থেকেই যায়। এ প্রতিবেদনে উদ্যোক্তা, অ্যাক্টিভিস্ট ও গৃহিণী- ভিন্ন অবস্থান থেকে তিন নারীর চোখে নির্বাচনী ইশতেহারে নারীর প্রত্যাশা নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন রিয়ানা ইসলাম রিম্পা
নারীবান্ধব সমাজ চাই
জাকিয়া শিশির, অ্যাক্টিভিস্ট

নির্বাচনী ইশতেহারে নারীর চাওয়া খুব জটিল কিছু নয়- বরং তা মৌলিক মানবাধিকারের সঙ্গেই সম্পর্কিত। সামাজিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য- এই বিষয়গুলো নারীর সমান অধিকার ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার ভিত্তি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রতিবার নির্বাচন এলেই এসব চাওয়া কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে। জাকিয়া শিশির মনে করেন, নারীবান্ধব ইশতেহার মানে কেবল ‘নারী’ শব্দটি যুক্ত করা নয়; বরং নারীর জীবনঘনিষ্ঠ সব সমস্যাকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা।
সহিংসতা বন্ধে নিতে হবে কঠোর অঙ্গীকার। নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, যৌন হয়রানি ও নির্যাতন বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা নারীর সবচেয়ে বড় দাবি। বিচারহীনতার সংস্কৃতি নারীর নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ইশতেহারে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে- সহিংসতার ঘটনায় শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করা হবে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে বিচার কার্যকর করা হবে। অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও শ্রমের স্বীকৃতি পেতে নারীর অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ছাড়া সমতা সম্ভব নয়। নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে সহজ ঋণ, প্রশিক্ষণ ও বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে সমান কাজের জন্য সমান মজুরি, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপনের প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে। গৃহস্থালি কাজের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন এবং এই শ্রমকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিও জোরালোভাবে উঠে আসা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ও প্রতিনিধিত্ব পেতে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ শুধু সংরক্ষিত আসনে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের মনোনয়ন বৃদ্ধি, তাদের জয়ের জন্য দলীয় সহায়তা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল জায়গায় নারীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। নারী নেতৃত্ব ছাড়া গণতন্ত্র পূর্ণতা পায় না।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার জন্য চাই নারীর কারিগরি ও উচ্চশিক্ষায় প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি, মাতৃস্বাস্থ্য, প্রজনন স্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন জরুরি। পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণে বিদ্যমান আইনগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন এবং বৈষম্যমূলক প্রথা ও আইন বাতিলের প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে। সাইবার নিরাপত্তা ও চলাফেরার অধিকার রক্ষায় খসড়া আইন বাস্তবায়ন জরুরি। ডিজিটাল পরিসরে নারীর নিরাপত্তা আজ বড় চ্যালেঞ্জ। সাইবার হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং ও অপমানজনক কনটেন্টের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং নিরাপদ চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
সবশেষে জাকিয়া শিশিরের প্রত্যাশা- নারীর সমস্যা যেন শুধু ভোটের হাতিয়ার না হয়- বরং মূল রাজনৈতিক এজেন্ডা হিসেবে গুরুত্ব পায়। নারীবান্ধব ইশতেহার তৈরি ও বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়বদ্ধতা সময়ের দাবি।
নারীর অধিকার হোক স্পষ্ট ও কার্যকর
শামসুন্নাহার লিপি, গৃহিণী

নির্বাচনী ইশতেহারে নারীর চাওয়া বলতে আমি সবার আগে বলব- নিজের ভোট নিজে দেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। একজন নারী যেন পরিবার, সমাজ বা কোনো চাপের মুখে নয়- নিজের বিবেচনায় ভোট দিতে পারেন, এই মৌলিক অধিকার রাষ্ট্রকেই সুরক্ষিত করতে হবে।
একজন গৃহিণী হিসেবে আমার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চাওয়া হলো- গৃহস্থালি কাজের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্যায়ন। সংসার সামলানো, সন্তান লালন-পালন কিংবা পরিবারের দেখভাল- এই অদৃশ্য শ্রমগুলো ছাড়া সমাজ সচল থাকতে পারে না। কিন্তু এসব কাজের কোনো স্বীকৃতি নেই। নির্বাচনী ইশতেহারে গৃহিণীদের কাজের মর্যাদা ও সামাজিক সুরক্ষার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা প্রয়োজন।
নারীর অধিকার সমুন্নত রাখতে সংবিধানেও আরও স্পষ্ট ও কার্যকর উল্লেখ থাকা জরুরি। পাশাপাশি সংসদে নারী আসনের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে, যেন নারীর কণ্ঠস্বর সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় শক্তভাবে উঠে আসে। শিক্ষাক্ষেত্রে নারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষায় প্রবেশাধিকার বাড়ানো দরকার। চাকরিরত নারীদের প্রসবকালীন ছুটি বৃদ্ধি এবং এই সুবিধা যেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর হয়- এ বিষয়েও ইশতেহারে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার থাকা প্রয়োজন। নারীশিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে আলাদা মন্ত্রণালয় গঠনের দাবি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে নারীর আত্মনির্ভরশীলতা বাড়াতে বিশেষ মন্ত্রণালয় গঠন করলে কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিতে গতি আসবে।
পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহারে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে জরুরি দাবি। নিরাপদ গণপরিবহন ছাড়া নারী কখনই স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারবে না। সব মিলিয়ে, নির্বাচনী ইশতেহারে নারীর চাওয়া কোনো অতিরিক্ত দাবি নয়- এগুলো মৌলিক অধিকার। রাজনৈতিক দলগুলো যদি সত্যিই নারীদের ভোট চায়, তবে এসব বিষয় প্রতিশ্রুতিবদ্ধভাবে ইশতেহারে যুক্ত করতেই হবে।
নিরাপত্তা ছাড়া উন্নয়ন অর্থহীন
তানিয়া ওয়াহাব, উদ্যোক্তা

নির্বাচনী ইশতেহারে নারীর চাওয়া বলতে আমি সবার আগে নিরাপত্তার কথাই বলব। একজন নারী ঘরের বাইরে বের হলে- রাস্তায়, কর্মক্ষেত্রে কিংবা ডিজিটাল মাধ্যমে- প্রতিনিয়ত অসম্মানজনক আচরণের মুখোমুখি হন। এই বাস্তবতা বদলাতে হলে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, কার্যকর শাস্তির নিশ্চয়তা দরকার।
নারীর নিরাপদ চলাচল, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং অফিস ও সামাজিক মাধ্যমে হয়রানির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ইশতেহারে স্পষ্টভাবে থাকতে হবে। শুধু আইন থাকলেই হবে না- আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ শাস্তির ভয় না থাকলে অপরাধ থামে না।
একজন উদ্যোক্তা হিসেবে আমি দেখি- অনেক নারী নিরাপত্তাহীনতার কারণে কাজের সুযোগ থেকেও পিছিয়ে পড়েন। ইশতেহারে যদি নারীর নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, তবে তা শুধু নারীর জন্য নয়- দেশের অর্থনীতির জন্যও ইতিবাচক হবে। নিরাপত্তা নিশ্চিত হলেই নারী আত্মবিশ্বাস নিয়ে সামনে এগোতে পারবেন।
