মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন বললেন যদি ইরানি বাহিনীগুলো গুলি শুরু করে তবে তিনি বিক্ষোভকারীদের উদ্ধার করবেন- শিভাস সিরজাদ তখন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বিশ্বাস করেছিলেন। ৩৮ বছরের এই পিতা আগে বিক্ষোভগুলোকে কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্দয়ভাবে দমন করতে দেখেছেন। কিন্তু তার জীবনে এটাই ছিল প্রথমবার দেখা যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বিক্ষোভকারীদের সাহায্য করতে প্রতিজ্ঞা করেছেন। তাই আত্মবিশ্বাসী হয়ে সিরজাদ পরিবারের সতর্কতা উপেক্ষা করে রাস্তায় অবস্থান নেন এবং বাড়তে থাকা বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে যোগ দেন।
সরকারি বাহিনীগুলো বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি করতে শুরু করল, কিন্তু কোনো সাহায্য এলো না। ৮ জানুয়ারি ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়, যার ফলে ইরানজুড়ে তথ্যপ্রাপ্তি ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। সিরজাদ তেহরানে একটি বিক্ষোভে গুলিবিদ্ধ হন এবং কয়েক ঘণ্টা পর মারা যান। তার ১২ বছরের একটি ছেলে রয়েছে।
নাম না প্রকাশের শর্তে তার এক আত্মীয় বলেন, সিরজাদ বিশ্বাস করেছেলেন অন্তিম মুহূর্তে হলেও ট্রাম্পের সাহায্য আসবে। আমরা তাকে বলেছিলাম বিক্ষোভে যোগ দিও না; এটা খুব বিপজ্জনক হবে। কিন্তু তিনি দৃঢ়ভাবে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘ট্রাম্প বলেছেন- তিনি আমাদের সমর্থন করছেন; আমি যাচ্ছি।’
মঙ্গলবার ট্রাম্প ইরানিদের বিক্ষোভ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দখল নিতে বলেন।
আরও বলেন, সাহায্য আসছে। ফলে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে ইরানের ওপর হামলা আসন্ন। কিন্তু একদিন পরই ট্রাম্প বলেন, তিনি ইরানি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিশ্চয়তা পেয়েছেন যে, ইরানি কর্তৃপক্ষ কোনো বিক্ষোভকারীকে ফাঁসি দেবে না। আপাতত তিনি ইরানে সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে পিছু হটছেন।
ইরানের বিক্ষোভকারীরা হতাশ। তেহরানের রাস্তাগুলো ফাঁকা। সশস্ত্র নিরাপত্তা বাহিনীগুলো পিকআপে চড়ে মহড়া দিচ্ছে, যেখানে কয়েক দিন আগেই হাজারো মানুষ বিক্ষোভ করেছিল। রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন প্রদেশে বিক্ষোভ চলছে। তবে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় এসব বিক্ষোভের প্রকৃত মাত্রা বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছে। গণগ্রেপ্তার অব্যাহত রয়েছে। ট্রাম্পের মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরলে বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি শুরু হবে বলেও তেহরানের এক বাসিন্দা গার্ডিয়ানকে জানিয়েছেন।
বিক্ষোভকারীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি গ্রহণ করা হচ্ছে এবং অনেকে ন্যায্যবিচার পাবেন না বলেও অনেক মানবাধিকার সংগঠনের আশঙ্কা। তবে দেশটির কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি না দেওয়ার পুনঃনিশ্চয়তা দিয়েছে।
ইরানিরা নিজেদের প্রতারিত মনে করছেন। দুই সপ্তাহ ধরে তারা ইরানের রাস্তায় নির্দয় দমনাভিযান দেখেছেন। ‘সাহায্য আসছে’Ñ ট্রাম্পের এই বিবৃতিই ছিল তাদের একমাত্র আশা। অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বসবাসকারী ইরানি বংশোদ্ভূত ইলহাম বলেন, এই ভাবনা ছিল ‘মুখে চপেটাঘাতের মতো’। আগে ইরানিদের দমে যেতে হয়েছে। এবার ভিন্নকিছু হতে চলেছে বলে তারা ভেবেছিলেন।
বিদেশে বসবাসকারী অনেক ইরানির মতে, ট্রাম্পের মুখের ভঙ্গি এমন যে তাতে ইরানি শাসকগোষ্ঠীর বিজয় নির্দেশ করছে। ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে উচ্ছেদে সাহায্যের পরিবর্তে তিনি তাদের সঙ্গে সমঝোতা করতে যাচ্ছেন। বুধবার ফক্স নিউজে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও যুক্তরাষ্ট্রকে কূটনৈতিক উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। অবস্থাদৃষ্টে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিকে সরাতে ও ইরানি শাসকগোষ্ঠীকে উৎখাতে ব্যর্থ হয়ে তাদের কাছে ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এক প্রকার পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছেন বলেই মনে করা হচ্ছে।
ইলহাম বলেন, যদি ট্রাম্প ইরানি শাসকগোষ্ঠীকে সুযোগ দেন, তবে এটি হবে সেই সব সাধারণ ইরানিদের সঙ্গে গভীর বিশ্বাসঘাতকতা, যারা মুক্তি পাবে না। এটা হবে আশার সমাপ্তি। অনেকেই ট্রাম্পের মতিগতির ভিন্নতার কথা বলেন, কিন্তু রাজনৈতিক মঞ্চের জন্য নিরপরাধ মানুষকে ব্যবহার অসহনীয়।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি থেকে সৈন্য সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে, আবার অনেক সামরিক সরঞ্জাম জড়ো করা হচ্ছে। এটা পরিষ্কার নয় যে ইরানের বিরুদ্ধে কি পদক্ষেপ নিতে পরিকল্পনা করছেন ট্রাম্প। যদিও নজিরবিহীনভাবে, দেশব্যাপী বিক্ষোভ ইরানি রাষ্ট্রের স্বল্পমেয়াদি স্থিতিশীলতাকে হুমকিতে ফেলেনি। দেশটির রয়েছে আধুনিক সব অস্ত্র এবং প্রশিক্ষিত নিরাপত্তা বাহিনী।
বিক্ষোভকারীদের কোনো প্রকার সুরক্ষা দেওয়া ছাড়াই ইরানের ওপর যে কোনো হামলা তাদেরকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর পাল্টা হামলা চালাতে বাধ্য করবে। অন্য ইরানি বিশ্লেষকরা যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছেন, মার্কিন হস্তক্ষেপ অভিযোগকে আরও তীব্রতর করবে যে- বিক্ষোভকরাীরা বিদেশি মদদপুষ্ট। এটি বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশ্যের কোনো যৌক্তিক উপকার করবে না।
এতদসত্ত্বেও ইরানের অভ্যন্তরে ও বিদেশে বসবাসকারী ইরানিরা আশা করছেন যে, তাদের সাহায্য করতে বিশ্ব কিছু করবে; যদিও তারা নিশ্চিত নন সেটা কি। একটি মার্কিন রণতরী মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাচ্ছে এবং ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করতে সামরিক সরঞ্জাম পুনঃমোতায়েন করা হচ্ছেÑ দুটি ইঙ্গিত যে, ইরানের ওপর মার্কিন হামলা এখনও সম্ভব।
‘বিক্ষোভে বিরতি চলছে। ইরানিরা অপেক্ষা করছেন ট্রাম্প কি করেন তা দেখতে’Ñ গার্ডিয়ানকে বলেন তেহরানের বাসিন্দা আলবোর্জ। গার্ডিয়ান অবলম্বনে।
