আমাদের সময় : ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম বর্তমানে কেমন জনপ্রিয়। গ্রাম ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে এটি কীভাবে ভূমিকা রাখছে?
ওমর ফারুক খাঁন : ব্যাংকিং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিংয়ের আওতায় আনতেই ইসলামী ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু করেছে। এই বিকল্প ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে এখন প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও সহজে ও নিরাপদে ব্যাংকিং সুবিধা পাচ্ছেন। এজেন্ট আউটলেটগুলোতে ব্যাংকের মতোই প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সেবা পাওয়া যায়, ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ফলে প্রত্যন্ত এলাকার বাসিন্দারা বাড়ির কাছেই ব্যাংকিং সেবা পাচ্ছেন, যা তাদের যাতায়াতের সময় ও খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সেবা- যেমন সেলফিন অ্যাপ ও বায়োমেট্রিক যাচাই- গ্রাহকের আস্থা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি শরিয়াভিত্তিক আধুনিক ব্যাংকিং সেবা হাতের নাগালেই পাওয়ায় গ্রাহকদের গ্রহণযোগ্যতাও বাড়ছে।
এই ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সহজে টাকা জমা ও উত্তোলন, রেমিট্যান্স গ্রহণ এবং ইউটিলিটি বিল পরিশোধের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন। ফলে এজেন্ট ব্যাংকিং গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছে এবং দিন দিন এর জনপ্রিয়তা আরও বাড়ছে।
আমাদের সময় : আমানত সংগ্রহ ও ক্ষুদ্র সঞ্চয়ে কী ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে?
ওমর ফারুক খাঁন : কোভিড-১৯ মহামারীর সময় থেকেই ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। অল্প সময়ের মধ্যেই এই সেবা ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। বর্তমানে ইসলামী ব্যাংক ২ হাজার ৭৮৮টি এজেন্ট আউটলেটের মাধ্যমে দেশব্যাপী ৪৭৭টি উপজেলায় আধুনিক ব্যাংকিং সেবা প্রদান করছে।
গ্রাহকদের আস্থা অর্জন এবং সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করার ফলে রেমিট্যান্স আহরণ, আমানত সংগ্রহ ও মোট লেনদেনের পরিমাণের বিচারে ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম দেশের ইন্ডাস্ট্রিতে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। দেশজুড়ে এজেন্ট ব্যাংকিং চালুর পর অল্প সময়ের মধ্যেই ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং গ্রাহকসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৮ লাখে।
গ্রাহকদের আস্থা ও জনপ্রিয়তার ধারাবাহিকতায় এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সংগৃহীত আমানতের পরিমাণ বেড়ে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৩১ শতাংশ বেশি। শুধু গত এক বছরেই এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আমানত বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি সৎ, দক্ষ, সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মধ্য থেকে বাছাই করে এজেন্ট নির্বাচন করে থাকে। এর ফলে লেনদেনে গ্রাহকদের আস্থা আরও দৃঢ় হয়, যা ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার প্রসার এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি জোরদারে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবার আওতায় সর্বাধিক আমানত সংগ্রহকারী ব্যাংক হিসেবে ইসলামী ব্যাংক শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। বর্তমানে ইসলামী ব্যাংক পিএলসি এজেন্ট ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্রিতে প্রায় ৪৫ শতাংশ মার্কেট শেয়ার নিয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
আমাদের সময় : প্রচলিত ব্যাংক শাখার তুলনায় এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও গ্রাহক সুরক্ষায় ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ কী ধরনের বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে?
ওমর ফারুক খাঁন : এজেন্ট আউটলেটে লেনদেন প্রক্রিয়া সহজ, নিরাপদ ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর। এখানে গ্রাহকের আঙুলের ছাপ (বায়োমেট্রিক) ব্যবহার করে লেনদেন সম্পন্ন করা হয়। প্রতিটি লেনদেনের ক্ষেত্রে গ্রাহকের নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে ওটিপি পাঠানো হয়। গ্রাহক ওটিপি প্রদান করলে লেনদেন সম্পন্ন হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে ওই নম্বরে লেনদেনের বিস্তারিত বিবরণসহ একটি এসএমএস পাঠানো হয়।
বড় অঙ্কের লেনদেনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দুজন এজেন্ট কর্মকর্তার অনুমোদন (ডুয়াল অথরাইজেশন) প্রয়োজন হয়। এর মাধ্যমে সম্ভাব্য ঝুঁকি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। লেনদেন পদ্ধতি সম্পর্কে গ্রাহকদের অবহিত করতে প্রতিটি এজেন্ট আউটলেটে প্রয়োজনীয় পোস্টার ও সচেতনতামূলক নির্দেশনা প্রদর্শন করা থাকে। পাশাপাশি গ্রাহক ও এজেন্ট কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে বিভিন্ন সময়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।
ঝুঁকি সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখতে নিয়ন্ত্রণকারী শাখার ব্যাংকের নিজস্ব দক্ষ কর্মকর্তারা এজেন্ট আউটলেটগুলোর কার্যক্রম নিয়মিত মনিটরিং করেন। এ ছাড়া শাখা ব্যবস্থাপনা সময় সময় আউটলেট পরিদর্শন করে থাকে। শাখা ও আঞ্চলিক কার্যালয়ের মাধ্যমে নিয়মিত অডিট কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
এ ছাড়া এজেন্ট মালিকদের জন্য মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসী অর্থায়ন প্রতিরোধবিষয়ক প্রশিক্ষণ ও সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সব মিলিয়ে ব্যাংকের নিবিড় তদারকি ও গ্রাহক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রমের ঝুঁকি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব বলে আমরা বিশ্বাস করি।
আমাদের সময় : বাংলাদশে ব্যাংকের নীতিমালা ও সাম্প্রতিক আর্থিক খাতের চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্প্রসারণে ইসলামী ব্যাংক কী সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ দেখছে?
ওমর ফারুক খাঁন : বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে গ্রামীণ জনপদে ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রমের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক সময়ে সময়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করছে, যা এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালার আলোকে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে রেমিট্যান্সসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা দেখছে, বিশেষ করে ডিজিটাল লেনদেনের প্রসারের ক্ষেত্রে। তবে এই খাত সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে।
বিপুলসংখ্যক এজেন্ট মালিক ও কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা, তারল্য ব্যবস্থাপনার ঝুঁকি- যেহেতু এজেন্ট আউটলেটগুলোর ভল্টে সীমিত পরিমাণ নগদ অর্থ রাখা সম্ভব, ফলে বড় অঙ্কের লেনদেনের ক্ষেত্রে গ্রাহককে এখনো শাখায় যেতে হয় এবং ডিজিটাল লেনদেনের সংখ্যা ও পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাইবার ঝুঁকির বিষয়গুলো বিশেষভাবে বিবেচ্য।
এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি মনিটরিং ও সুপারভিশন জোরদার করার পাশাপাশি গ্রাহক ও এজেন্ট মালিকদের সমন্বিত সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা আরও বিস্তৃত ও নিরাপদভাবে পরিচালনা করে যাচ্ছে।
আমাদের সময় : ডিজিটাল লেনদেন, মোবাইল ব্যাংকিং ও কিউআর ভিত্তিক সেবার সঙ্গে এজেন্ট ব্যাংকিংকে সমন্বয় করার ক্ষেত্রে ব্যাংকের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
ওমর ফারুক খাঁন : বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে একটি ওপেন ব্যাংকিং সিস্টেম চালু করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে ডিজিটাল লেনদেন, মোবাইল ব্যাংকিং ও কিউআর কোডভিত্তিক সেবার মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বায়োমেট্রিক নিরাপত্তা এবং অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস (এপিআই) ব্যবহার করে একটি সমন্বিত, নিরাপদ ও গ্রাহককেন্দ্রিক আর্থিক ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে গ্রাহকরা শাখায় না গিয়েই সহজে বিভিন্ন ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ করতে পারবেন।
এজেন্ট পয়েন্টগুলোতে একটি অভিন্ন ও সমন্বিত আন্তঃপরিচালনযোগ্য ডিজিটাল লেনদেন প্ল্যাটফর্মের (আইডিটিপি) আওতায় কিউআর কোড (বাংলা কিউআর) ব্যবহারে বাধ্যবাধকতা তৈরি করা হচ্ছে। এর ফলে গ্রাহকরা যে কোনো ব্যাংকের অ্যাপ কিংবা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস)- যেমন সেলফিন, এমক্যাশ, বিকাশ, নগদ ও রকেট ব্যবহার করে এজেন্ট পয়েন্ট থেকেই ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ করতে পারবেন।
এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি এজেন্ট ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে এক কোটি হিসাব খোলা এবং ৬০ হাজার কোটি টাকা আমানত সংগ্রহের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি গ্রাহকসেবার মান আরও উন্নত করা এবং রেমিট্যান্স কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার লক্ষ্যেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
